Header Ads

মুনশি একাডেমি

শিক্ষা ও সাহিত্যভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
নোট ও সাজেশন বিসিএস ও এনটিআরসিএ বি.এড ও ব্যাংক প্রস্তুতি

ভুল হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে : সমকালীন জীবনের নিখুঁত ক্যানভাস - মুনশি আলিম

 

ভুল হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে : সমকালীন জীবনের নিখুঁত ক্যানভাস

মুনশি আলিম

 

বই আলোচনা, মোহাম্মদ হোসাইন, কোথাও ভুল হচ্ছে, কাব্যগ্রন্থ রিভিউ, সাহিত্য সমালোচনা, মুনশি আলিম, আধুনিক বাংলা কবিতা, দিয়া প্রকাশ, কবিতা বিশ্লেষণ, সমকালীন কবিতা, শব্দজাদুকর, কবিতার শিল্পরূপ, বাংলা সাহিত্য, কাব্য পাঠ প্রতিক্রিয়া, সৃজনশীল সাহিত্য

 

মোহাম্মদ হোসাইন বাংলা কাব্যজগতে একটি আলোকিত নাম। ২০১৭ সালে দিয়া প্রকাশ থেকে বের হয়েছে তাঁর ভুল হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে কাব্য। সাড়ে চার ফর্মার এই বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে কবির সৃষ্টিশীলতার অপূর্ব মহিমা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বলাকা কাব্যের মতো কবি মোহাম্মদ হোসাইন’র কবিতাগুলোও শিরোনামহীন। কেবল ক্রমিক দিয়ে কবিতাগুলোকে স্বতন্ত্র করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে শেষের দিকে কয়েকটি কবিতার নামকরণ রয়েছে। তাঁর কবিতাগুলোতে একদিকে যেমন রয়েছে স্মৃতিকথন অন্যদিকে রয়েছে শিল্পের নিখুঁত ছোঁয়া। তাঁর কবিতার ভাঁজে ভাঁজে খেলা করে সাজানো সুন্দর। বনেদী শব্দসংসারের তিনি যেনো রাজসিক গৃহকর্তা! এককথায় বলা যায় শব্দজাদুকর!

“বরজদানা হয়ে ফুটে আছে ঘামের চিকুর। টান টান চিলা থেকে ভেসে আসছে অযৌন শব্দের ধূন।” কিংবা “একটা ট্র্যাডিশনাল পিরিয়ডে আছি, কোথা দিয়ে যে কী হয়ে যাচ্ছে! জল থেকে পচা গন্ধ বেরুচ্ছে, সুড়ঙ্গ থেকে বেরুচ্ছে ঝাঁঝালো অন্ধকার ...।”

কবিতাগুলো বাস্তবতার রূপ-রস-গন্ধে অনন্য হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো কবিতা বার্তাহীন হলেও তা শব্দ-গন্ধে ভরপুর। মনের চৌহদ্দিতেই তার ইচ্ছেগুলো বড়ো হয়, বেড়েও ওঠে। স্বীয় অনুভূতির অন্দরমহলে তিনি সত্য ও সুন্দরের সওদা করে চলেছেন আপন মনে; যেভাবে রাধার জন্য কৃষ্ণ বাঁশি বাজিয়েছিলো আপন মনে। ইতিহাসের সুঘ্রাণে আট সংখ্যক কবিতাটি হয়ে উঠেছে অন্যরকম সুন্দর। কবিতার শহরে তিনি যেনো হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মতো নিবিষ্ঠ মনে নিজের কর্ম করে চলেছেন। তথ্যসূত্রের মতো তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে প্রজন্মান্তরের সাতকাহন।

সক্রেটিস যেমন বরফের ওপর দিয়ে অবলীলায় হেঁটে যেতে পারতেন কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই তেমনি কবি মোহাম্মদ হোসাইনও কোনো রূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই বোধের ভিতর দিয়ে চিন্তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রজন্মান্তরের কাছে। কবি একদিকে যেমন প্রকৃতির বন্ধনায় বিভোর অন্যদিকে তেমনি মানস প্রিয়ার সান্নিধ্য লাভে অপেক্ষমান। কবি তাঁর কাব্যে অনেক জায়গাতেই প্রতীকী ব্যঞ্জনা আনয়নের চেষ্টা করেছেন। কবির ভাবনায় নিখুঁত হয়ে ধরা দিয়েছে বিশ্বের নানা বিচ্যুতি। বিপদ কখনো স্থায়ী হয় না। বিপদ এলে পৃথিবীও কখনো থেমে থাকে না। যেভাবে ঝড়-বৃষ্টিতে পৃথিবী থেমে থাকে না। বাস্তবতার আবহে গাথা তাঁর কবিতাগুলো পাঠ শেষেও চিন্তায় যেনো অনুরণন তোলে।

“মানুষের কুকীর্তি ফেরি করে ফেরে ফেরারি বাতাস/লোহা আরও লোহা হয়ে যায়/মথ থেকে সরে যায় মথের ধর্ম/মাটি থেকে মাটির মর্মাথ ... কেবল জেগে থাকে চোখ, চুলে বিলি কাটা অনঙ্গ প্রহর।”

আবহমান কাল থেকেই পৃথিবী ক্ষমতার দাস! মানুষের সুকীর্তি খুব কম প্রকাশ পায়। নৈতিকতা থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে আধুনিক জন-জীবন। প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে চিন্তার স্বর, চিন্তার বলয়! বৈশ্বিক উষ্ণতায় ওজোন স্তরের মতো ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে পৃথিবী। বিশ্বাসের মূল্যায়নও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। কবির কবিতায় এমনও নানাদিক অত্যন্ত শৈল্পিক হয়ে ফুটে উঠেছে।

উনিশ সংখ্যক কবিতায় উঠে এসেছে মানব জন্মের ইতিহাস। জন্ম মৃত্যুর খেলা বড়োই আজব! ক্ষত বিক্ষত হয়েও সময়ে অনেক কিছু সয়ে যায়। বিশ সংখ্যক কবিতায় লোকজ উপাদানের সুঘ্রাণ মিলে। পল্লিকবি জসীম উদদীনের কবিতার ভাঁজে ভাঁজে যেমন পল্লিপ্রকৃতির নিসর্গের ছোঁয়া মিলে, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন ইতিহাসচেতনাসহ প্রকৃতির ছোঁয়া মিলে তেমনি কবি মোহাম্মদ হোসাইনের কবিতাতেও যেনো এর কিয়দাংশের ছাপ পরিলক্ষিত হয়। একুশ সংখ্যক কবিতাটিতেও রয়েছে ইতিহাস ও পুরাণের আশ্রয়। চব্বিশ সংখ্যক কবিতার বিষয়বস্তু ও নির্যাসের বর্ণিল ঝরনা ধারায় কবিকে মনে হয় নব্য জীবনানন্দ!

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মানুষ উদাসীন। মানুষের ভিতরের সত্ত্বা ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। কবি ত্রিকালদর্শীর মতো করে বর্তমান মানবসমাজের অন্ত্যজ ক্লেদ, বিচ্যুতি, মানব অবক্ষয়, জিঘাংসা প্রভৃতি বিষয়কে শব্দব্যঞ্জনা আর উপমায় পাঠকের হৃদয়ের একেবারে কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। কবিতার ভাষায়-

“অথচ, কী অদ্ভুত সময় আমাদের; রঙ্গণের ভেতর জলপাই রঙের সাপ, ভারী ভারী ধাতব শব্দে মিশে থাকে বুকে ও পাথরে, শতদ্রুম ঝরনার শিয়রে, পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফের চাড়-হাতির শুঁড়ের মতো স্তম্ভিত অন্ধকার।”

কবি কল্পনার রঙিন কৌটো নিয়ে ঘুরেন। যে কৌটোর গায়ে লেগে থাকে শিল্পের সুষমা। নিবিষ্ঠ মনে নিজের মতো করে প্রলেপ লাগান কবিতার শরীরে। কবিতা প্রাণবন্ত শিশুর মতো নড়েচড়ে ওঠে। আবেগের গোপন ঘরে আবেদন জানায়। ভাবনা ও দৃষ্টির সীমানায় সত্য ও সুন্দরের মিশেলে তা হয়ে ওঠে বস্তুনিষ্ঠ আর শৈল্পিক।  

কবিতার রোমান্টিক আবহে কখনো কখনো মনে হয় প্রিয়ার যত কাছে যাওয়া যায় ততই যেনো কাক্সিক্ষত সুখ! বিয়াল্লিশ ও তেতাল্লিশ সংখ্যক কবিতার শরীর জুড়ে রোমান্টিক আবহ ফুলে-ফেঁপে ওঠেছে। কাব্যের মধ্যে সাইজের দিক থেকে সবচেয়ে বড়ো সংখ্যক কবিতা ‘পাঁজর ক্ষরিত দীর্ঘশ্বাস’। এতে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে উঠে এসেছে কবিজীবনের নানাদিক। দুরন্ত শৈশবের ঘোড়ায় চড়ে কখনো তিনি পাড়ি দিতে চেয়েছেন কাল্পনিক সুখময় তেপান্তরের মাঠ। জীবনের পাওয়া না পাওয়ার নানাবিধ হিসেবনিকেশ অবললীলায় শৈল্পিক হয়ে ফুটে উঠেছে এ কবিতায়। পুরো কবিতাপাঠে মনে হবে এটিই যেনো সবচেয়ে বয়স্ক কবিতা! কবির ভাষায়-

“বোধের ভেতরে ফালি ফালি অন্ধকার, অবাধ্য ষাঁড়ের মতো ধেয়ে আসে.../একদিন তোমার-আমার অথচ আজ?/আজ আমি দাঁড়কাক হয়ে ঝুলে থাকি রাতের পর রাত দিনের পর দিন।”

বাংলা কাব্য কিংবা কথাসাহিত্যে অনেকেই স্বার্থক চরিত্র¯্রষ্টা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নিখিলেশ’ কিংবা বরুনা, জীবনানন্দ দাশের ‘সুরঞ্জনা’ কিংবা ‘বনলতা সেন’, হুমায়ুন আহমেদ’র ‘হিমু’, কিংবা ‘মিছির আলী’ যেমন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং কালজয়ী তেমনি মোহাম্মদ হোসাইনের ‘নিমাই’, ‘জয়া’ কিংবা ‘মৃদুল’ চরিত্রও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মৃত্যুর চার মাস আগে জন্মদিনে কাব্যের ‘ঐকতান’ কবিতায় যেমন আত্মসমালোচনা করেছেন তেমনি কবি মোহাম্মদ হোসাইনও ‘নষ্ট দোতারা’ নামক কবিতায় নিজের অপূর্ণতার কথা অবলীলায় স্বীকার করেছেন। কাব্য পঠনপাঠনে মনে হবে-কবি ও কবিতার ভেতর যেনো তাঁর নিত্য বসবাস। হৃদয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে তিনি যেনো অনাদিকাল থেকে হেঁটে চলেছেন সত্য ও সুন্দরের সন্ধানে।

সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি’র সিনেমা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আর্থার সি ক্লার্ক এবং রোজারিও বলেছিলেন-“পথের পাঁচালী পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাঁর এই ছবিটি না দেখলে পৃথিবীর অনেক কিছুই দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।” এর সাথে মিলিয়ে বলা যায়-মোহাম্মদ হোসাইনের কবিতা না পড়লে বাংলা কবিতার অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে! ভুল হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে-সত্যিই তাঁর কাব্যটির পঠন-পাঠন অপূর্ণ থাকলে মনে করতে হবে একজন নিষ্ঠাবান কবিতাকর্মী ও পাঠকের কোথাও ভুল হচ্ছে! 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.