‘হিজলের রং লাল’: ইতিহাস আশ্রিত সমাজ দর্পণের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি - মুনশি আলিম
‘হিজলের রং লাল’: ইতিহাস আশ্রিত সমাজ দর্পণের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি - মুনশি আলিম
স্থান-কাল-পাত্রভেদে সময় কথা বলে। কথা বলানো হয়। এই কথা-বলানো সকলে পারে না। কেউ কেউ পারে! ওই যে জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছিলেন, “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি!” ঠিক তেমনি। যাঁরা পারে তারা আমাদের নমস্য। সমাজেরও পূজনীয়। সাধারণের চিন্তাভাবনাগুলোকে যাঁরা নিপুণ কুশলতায় শৈল্পিকভাবে তুলে ধরতে পারে, কালের গর্ভ থেকে যাঁরা ইতিহাসকে নিংড়ে পরিস্ফুটন করে আবেগ মাখিয়ে উপস্থাপন করতে পারে- তারা আর যাইহোক সাধারণ নন। কথাসাহিত্যিক জফির সেতুর ‘হিজলের রং লাল’ উপন্যাসটি পড়লে ঠিক তেমনি মনে হয়। তাঁর উপন্যাসে জীবন সংশ্লিষ্ট চিন্তাভাবনা, কাহিনি, সংলাপ চয়ন, সময়ের ঐক্য, ঘটনাপ্রবাহ, চরিত্র চয়ন, ঘটনার ঘনঘটা, ইতিহাসের অবিকল প্রতিচ্ছবি, সমাজ দর্শন, চিত্রকল্প, সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়েছে সত্যিই তা অন্যরকম; তা যেমন চিন্তায় তেমনি চেতনায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রূপ ভিন্ন। মহাকালের উচ্চ শিখরে সে অনেকটাই বিশাল স্থান করে নিয়েছে। সময়ে তা কেবলই স্মৃতি। কিন্তু আমি বলবো তা কেবল স্মৃতি নয়, তা একটি চেতনা। জাতীয় চেতনা। এর স্মৃতি আঁকড়ে ধরা মানে প্রকারান্তরে চেতনাকেই লালন করা।
এখনো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের স্মৃতিপটে অবগাহন করে চিন্তাশীল হৃদয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর যে বা যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে কথাসাহিত্য রচনা করেছেন তাদেঁর সত্যিই আঙুল গুনে গুনে বের করা যায়!
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আশ্রয় করে রচিত সব উপন্যাসই আমাদেরকে কাছে টানে না। আকর্ষণ করে না। কিন্তু কেন করে না? তবে কি ধরে নেব পাঠক হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতা? নাকি যারা আকর্ষণ করাতে জানে না তাদের ব্যর্থতা? বইয়ের মান ভালো হলে তা অনায়াসেই পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। ভালো একটি গান যেভাবে দ্রুত দর্শকপ্রিয়তা পায়, ঠিক তেমন চিত্র দেখা যায় বইয়ের ক্ষেত্রেও। লেখকের ক্ষেত্রেও।
২০১৬ সালে বেহুলাবাংলা প্রকাশন থেকে বের হয় ‘হিজলের রং লাল উপন্যাসটি। সাড়ে পাঁচ ফর্মার বই। প্রচ্ছদ করেছেন বিপুল চক্রবর্তী। তাঁর প্রচ্ছদ জুড়েও রয়েছে রহস্যময়তার ক্যানভাস; যে ক্যানভাসের ভেতর দৃষ্টিপাত করলে পুরো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিপট থেকেই ঘুরে আসা যায়!
জফির সেতুর উপন্যাসটি পড়লে মনে হয় এর ঘটনাগুলো কতো পরিচিত! চরিত্রগুলোকে মনে হয় আমাদের প্রতিবেশি কিংবা ঘরের কোনো নিকটাত্মীয়। যেনো হাজার বছর ধরে তারা বাংলার প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর রূপ-রস-গন্ধ ছুঁয়ে বেঁচে রয়েছে!
ঔপন্যাসিক নিজেই বলেছেন, উপন্যাসটির মূল কাহিনি বাস্তবতার ঘটনা অবলম্বনে। মূলত মুক্তিযুদ্ধকালীন চার নম্বর সেক্টর ও পাঁচ নম্বর সেক্টরের স্মরণীয় কিছু ঘটনার চিত্রায়ণ রয়েছে এই উপন্যাসটিতে। উপন্যাসের মূল কাহিনি শুরু হয়েছে অগ্নির বাবা শিহাবের ‘ডায়রি’-কে কেন্দ্র করে। অগ্নি বিছানায় উপুর হয়ে তার বাবার ডায়রি পড়ছিলো।
উপন্যাসটি কোনো আকস্মিক সংলাপ কিংবা ঘটনা দিয়ে শুরু নয়; কাব্যিক উপমায় সিক্ত! যেমন: “আশ্বিনের সূর্যাস্তবেলায় সাদা কাশগুচ্ছের ওপর সূর্যের বিচ্ছুরিত রং পিয়াইনের পানিতে আগুন ধরিয়ে দিলে বাবা বিড়বিড় করে বলেছিলেন, ‘এই বংশে এক মেয়ে হবে তোমার ঔরসে। ওর নাম অগ্নি’।”
উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণেও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আশ্রব আলী, মশ্রব আলী, ছিদেক আলী, সুরুজ আলী- গ্রামদেশে এখনো এরূপ নামকরণের মিল লক্ষ করা যায়। ঔপন্যাসিক যেনো গ্রামের সে নিটোল চিত্রই তার উপন্যাসের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
উপন্যাসের ঘনঘটায় প্রাণ দান করেছে সফিনা বিবি, মেহের বানু, সায়রা বানু, জমশিদ মিয়া, জাবির আলী, মায়মুনা, উকিল মিয়া, প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলাম, আব্দুল ওয়াহিদ, শিহাব মাস্টার, সাচ্চু রাজাকার, দরবেশ রাজাকার, আবু (রাজাকারের ছেলে), পাকিস্তানি লেফটেন্যান্ট রাব্বি প্রমুখ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোতে হিন্দু রাজাকারের নাম কখনো ওঠে এসেছে বলে আমার জানা নেই। আমার ধারণা, জফির সেতুই প্রথম সাহস করে ইতিহাস কচলিয়ে সত্য ও সুন্দরের নির্যাসটুকুই উঠিয়ে এনেছেন। তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, একাত্তরে মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু রাজাকারও ছিলো! দেশে মুসলিম রাজাকারদের গণহারে বিচার হলেও এখনো কোনো হিন্দু রাজাকারের বিচার হয়নি। এমনকি নামও আলোচনায় আসেনি। যা বড়ই দুঃখজনক। সিলেটের নোয়াগাওয়ের হিন্দু রাজাকার সজল দেবনাথের মতো হয়ত বাংলাদেশে এখনো অনেক হিন্দু রাজাকার রয়েছে। একটু চোখ-কান খোলা রেখে সন্ধান করলেই তাদের পরিচয় মেলানো সম্ভব।
উপন্যাসের অনেকটা জায়গা জুড়েই জান্নাতুল মেওয়া এবং ফুলবানু চরিত্র রয়েছে। চরিত্রদ্বয়কে বেশ একটা ফুটতে দেওয়া হয়নি। অর্ধফুটন্ত চরিত্র হিসেবে এসেছে নবীন এবং ইমরান; যদিও ইমরান থেকে নবীন বেশি সক্রিয়। নবীন নায়ক হওয়ার কথা থাকলেও তাকে ছাপিয়ে উঠেছে রুশো কবির। যদিও রুশো কবিরকে মূল নায়ক হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না।
কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে অগ্নি যথেষ্ট উজ্জ্বল। ঔপন্যাসিক মূলত অগ্নি নামের নামকরণের মধ্য দিয়ে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির একটি মেলবন্ধন সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তা না করলেও উপন্যাসের তেমন একটা ক্ষতি হতো না। অগ্নিকে ঔপন্যাসিক অত্যন্ত দরদ দিয়ে নির্মাণ করেছেন। শিহাব মাস্টারকেও। ঔপন্যাসিকের অনাগ্রহ সত্ত্বেও এই দুই চরিত্রকে ছাপিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ছিদেক আলী।
মুক্তিযুদ্ধের মূলরসদ বা ঘটনার ঘনঘটা শুরু হয় উপন্যাসের পঞ্চাশ পৃষ্ঠা থেকে। যার নেতৃত্ব থাকে মেজর মীর শওকত এবং তার কর্মকাণ্ড! ঔপন্যাসিকের বাস্তবঘেঁষা বর্ণনার ছটায় পাঠক অনায়াসেই হারিয়ে যায় ইতিহাসের গভীর থেকে গভীরে। যেথা পাঠকের মন সুখে-দুঃখে আকুলি-বিকুলি করে। রোদন করে। আবেগের আতিশয্যে শিহরিতও হয়। পাঠক উপন্যাস পড়ে উজ্জিবিত হলে, শিহরিত হলে, আকুলি বিকুলি করলে, কিংবা রোদন করলে নিঃসন্দেহে ঔপন্যাসিকের ভাঁড়ারে স্বার্থকতার সম্মানসূচক উপাধিটি জমা হয়।
বাষট্টি পৃষ্ঠা জুড়ে শুরু হয় সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত এর ক্ষুরধার ভাষণ। যে ভাষণ স্মরণ করিয়ে দেয় নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যক্ষুধা’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘আনসার’র সাথে। মানুষকে উজ্জিবিত করতে যেমন আনসারের জুড়ি ছিলো না, তেমনি জুড়ি মেলা ভার মীর শওকতের বক্তৃতায়। বাস্তবের সাথে মিল রেখেই ঔপন্যাসিক মীর শওকতের মুখে তেজস্বী বক্তৃতার ছক একেঁছেন। তাই বলা যায় উপন্যাসটি ইতিহাস বান্ধব।
উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে তিনি যেমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তেমনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন চরিত্রগুলোর সংলাপ চয়নে। মূল চরিত্রগুলোর মুখে এটেঁ দেওয়া হয়েছে সিলেটি আঞ্চলিক ভাষা। যেহেতু মূল কাহিনি সিলেটকে কেন্দ্র করে সেহেতু তাঁর সংলাপ চয়ন অবশ্যই যথার্থ। ঘটনা প্রবাহেও রয়েছে একের পর এক চমক। তথ্য-উপাত্তেও রয়েছে নতুনত্ব। কিছু সংখ্যক বানান প্রমাদ, বাক্যজনিত ত্রুটি ও কোথাও কোথাও অতিরঞ্জিত বয়ান সত্ত্বেও উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের জন্য একটি মাইলফলক স্বরূপ বললে বেশ একটা অত্যুক্তি হবে না।
------------------------
২৬.১০.২০১৬
মুনশি আলিম
সোনার পাড়া, শিবগঞ্জ, সিলেট


কোন মন্তব্য নেই