কালের আয়নায় নারী মুক্তির হালচাল : মুনশি আলিম
কালের আয়নায় নারী মুক্তির হালচাল-মুনশি আলিম
সমস্ত পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ছয়শ’ কোটির মতো মানুষ রয়েছে। পৃথিবীর এই বিপুল জনসংখ্যার প্রায় অর্ধাংশই নারী। নারী সম্ভবত মহাজগতের সবচেয়ে আলোচিত প্রাণী। প্রাচীনকালে নারী ও পুরুষ নিজেদের লজ্জা-সম্ভ্রম নিয়ে তেমন একটা ভাবতো না। ভাবতো না তাদের জীবিকা নিয়েও। নারী ও পুরুষরা তখন দলবদ্ধ হয়েই জীবিকা নির্বাহের জন্য ফলমুল সংগ্রহ ও বিভিন্ন প্রকার পশু-পাখি শিকার করত। বিশেষ বিশেষ রীতি-নীতির উদ্ভব না হওয়ার কারণে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা ছিলো অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ। অর্থাৎ নারী পুরুষের মাঝে তখন ছিলো অবাধ যৌনাচার।
যৌনমিলনে নারীরা গর্ভবতী হতো। স্বভাবসুলভ যাযাবর হওয়ার কারণেই তারা একস্থান থেকে অন্যস্থানে গমন করতো। কখনো বা পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিয়ে তাদের সম্মুখে চলতে হতো। আর তখনই ঘটত গর্ভবতী নারীদের জন্য বিপদ। কেননা, গর্ভবতী নারীদের উঁচু ভূমিতে আরোহণ কিংবা চলাচল ছিলো খুবই কষ্টসাধ্য। গর্ভবতী নারীরা যুদ্ধক্ষেত্রেও ছিলো অপারগ। কাজেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সম্মুখে চলতে না পারার কারণে ক্রমে ক্রমে গৃহই হয়ে উঠে তাদের প্রধান আশ্রয়স্থল।
মধ্যযুগে সমস্ত পৃথিবী ব্যাপীই যখন ধর্মীয় প্রভাবের ব্যাপক ছড়াছড়ি তখন নারীরা বহিরাঙ্গন থেকে আরো গুটিয়ে যেতে থাকে। বিশেষ করে মুসলিম নারীরা। পুরুষ নারীকে সাজিয়েছে অসংখ্য অভিধায়। যে অভিধায় সমূহের কোনো কোনোটি এমন কুৎসিত যা বলা বাহুল্য। সমাজ ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার পর থেকেই ক্রমে ক্রমে পুরুষ সমাজ চালানোর পুরো দায়িত্বভার গ্রহণ করে, আর নারীদের গৃহবন্দী করার জন্য তৈরি করতে থাকে বিভিন্ন সামাজিক শৃঙ্খল। পুরুষ নারীকে বন্দী করার জন্য তৈরি করেছে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্র। সৃষ্টির পর থেকে পুরুষরা নারী সম্পর্কে যে সব শ্লোক, বিধি-বিধান তৈরি করেছে তার সবটাই প্রায় সন্দেহজনক ও আপত্তিকর। নারী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পুরুষের সাজানো বিধিবিধানে ক্রমে শৃঙ্খলিত নারীর অন্তরও পুরুষের প্রতি থাকে ভীত-সন্ত্রস্ত।
এটা অপ্রিয় সত্য যে, পুরুষ নারীকে দেখে দাসী রূপে। প্রাত্যহিক কাজকর্মের মাধ্যমেও করে রেখেছে দাসী। ঘটনার ঘনঘটায় পড়ে কিংবা স্বীয় স্বার্থে ও অপ্রত্যাশিত ভয়ে পুরুষ কখনো কখনো নারীর জয়গান করে মহীয়সী রূপে কিংবা দেবী রূপে। সুপ্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ প্রহর ধরে পুরুষ শুধু তার জৈবিক চাহিদা চরিতার্থ করার জন্যই নারীকে প্রয়োজন এবং খানিক মূল্যবানও মনে করে আসছে। যৌনাচার সম্পন্ন করার মুহূর্তগুলিতে পুরুষরা নারীকে অভিহিত করতে থাকে বিভিন্ন মন ভোলানো নিছক অভিধায়। নারী তাতে বিগলিত হয়; কিন্তু স্বীয় অজ্ঞতায় ভুলে যায় পুরুষের এই সাজানো প্রতারণার কথা। পুরুষশাসিত সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই পুরুষরা নারীকে অবদমিত করতে করতে এতটাই করেছে যে, নারী এখন পুরুষষের কোনো খারাপ কাজেরও বিরুদ্ধাচারণ করতে ভয় পায়। নারীর যে নিজস্ব অস্তিত্ব রয়েছে, তারও যে নিজস্ব চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ রয়েছে তা সে বেমালুম ভুলে যায়! প্রকৃত পক্ষে তারা ভুলে যায় না, তাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়।
নারীর বিবেকবোধ সুপ্ত। সে নিজেও যে পুরুষের ন্যায় স্বতন্ত্র্য সত্তা, তার চিন্তাভাবনা, কর্মও যে মূল্যবান কিছু হতে পারে, সভ্যতার অগ্রগতিতে সেও যে মূল্যবান কোনো অবদান রাখতে পারে- এমন প্রশ্ন হয়ত কোনো কোনো নারীর মনে কখনো কখনো জাগে; কিন্তু তা স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারে না। কেননা, সমাজ কাঠামোকে পিতৃতন্ত্র এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে যে, একা বা স্বল্পাংশের ক্ষুদ্র চিন্তনে তার মুক্তি সম্ভব নয়।
বর্তমান সভ্যতা হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতা বা পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতা। পুরুষরা সূর্যের মতোই সচল, সভ্যতার বাহক। পুরুষদের তৈরি করা সভ্যতায় নারী অচল, তার আরেক রূপ অন্ধকার। বিনির্মিত সভ্যতার অন্দরমহলে পুরুষ মুখ্য, নারী গৌণ। এ প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদের উক্তি প্রণিধানযোগ্য :
পুরুষ প্রভু, নারী দাসী। পুরুষ শরীর, নারী ছায়া; পুরুষ ব্রাহ্মণ, নারী শুদ্রী; পুরুষ বিকশিত, নারী অবিকশিত। পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় পুরুষ নিয়ন্ত্রক আর নারী নিয়ন্ত্রিত; পুরুষ শোষক; নারী শোষিত। পুরুষ সভ্যতার শির্ষে আরোহণ করে ক্রমে ধারাবাহিক ভাবে জয়গান করে চলেছে নিজেদের। পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় পুরুষের জয়গান করা হয় ততই করা হয় নারীর জন্য নিন্দা। নারী অধম, অর্থব, পরনির্ভরশীল ইত্যাদি। নারীর প্রারম্ভিক রূপ হচ্ছে শিশু। কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না ক্রমশ নারী হয়ে উঠে। (নারী, হুমায়ূন আজাদ : ১৯)
পুরষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, একটি মেয়ে শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর যেদিকে তাকায় সেদিকেই দেখে পুরুষের আধিপত্য। গোটা পৃথিবীটাই যেনো পুরুষের। পিতৃতন্ত্রের পরিবার শিখায় পুরুষ প্রধান, সমাজ শিখায় পুরুষ প্রধান, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, প্রচার মাধ্যম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শেখায় পুরুষ প্রধান। অবস্থা দেখে মনে হবে যেনো সমাজ রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা পুরুষের প্রাধান্য, প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের সংস্থা। সতীত্ব নারীকে পুরুষের দেওয়া একটি উপাধি। শরৎচন্দ্র, অনিলা দেবীর ছদ্মনামে বলেন :
“সতীতের বাড়া নারীর আর গুণ নাই। সব দেশের পুরুষই একথা বোঝে, এটা পুরুষের কাছে সবচেয়ে উপাদেয় সামগ্রী। ... এই সতীত্ব যে নারীর কতবড় ধর্ম হওয়া উচিত, রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণাদিতে সে কথার পুনঃ পুনঃ আলোচনা হইয়া গিয়াছে।........ এখানে স্বয়ং ভগবান ইন্দ্র পর্যন্ত সতীত্বের দাপটে কতবার অস্থির হইয়া গিয়াছেন। কিন্তু সমস্ত তর্কই একতরফা একা নারীরই জন্য। (শরৎ রচনাসমগ্র ১, ঢাকা : ১০০৯-১০১০)
পুরুষ এখনো নারীকে দেখে ভোগ্যপণ্য রূপে। গুন্টার গ্রাসের বিখ্যাত একটি কবিতায় আমরা তারই চিত্র স্পষ্ট দেখতে পাই :
পুরুষ চুষতে দেয় না
বড় ওলান ঝুলিয়ে গাভী যখন
বাড়ীর পথে রাস্তা পেরোয়, যানবাহান থামিয়ে দিয়ে
পুরুষরা কেবল তৃতীয় স্তনের স্বপ্ন দেখে
পুরম্নষ দুগ্ধ পোষ্য শিশুকে ইর্ষা করে। (গুন্টার গ্রাস সংকলন, ঢাকা : ১৯)
উপনিষদের ঋষি স্ত্রী সম্পর্কে মনু ও তাহার পোষদ সামন্তসমাজ হতে বহু স্পষ্ট উক্তি করেছেন। ঋষির বক্তব্য ছিলো-“নবৈ ভার্যায়া : কামায় ভার্ষা প্রিয়া ভবিত। আত্নানমত্ম কামায় ভার্যা প্রিয়া ভবতি অর্থাৎ স্ত্রীর নিজের রুচির জন্য স্ত্রী প্রিয় হয় না, পুরুষের রুচি বিধানের জন্যই স্ত্রী প্রিয় হয়।’’ (মানব সামজ, ঢাকা : ১৪২) নারীদের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। তারা পরাধীন। এ বিষয়ে একটি নীতি বাক্য করতে পারি-পিতা রক্ষতি কৌমারে, ভতা রক্ষতি যৌবনে। পুত্র রক্ষতি বার্ধক্যে। ন স্ত্রি স্বাতন্ত্র্যমহতি অর্থাৎ কুমারীকালে তাহার রক্ষক পিতা, যৌবনকালে পতি এবং বার্ধক্যেও রক্ষক হবে পুত্র। অর্থাৎ স্ত্রীর কখনো স্বতন্ত্রতা থাকা উচিত নয়।’
মনুসংহিতায় বিধবা বিবাহ নিয়েও রয়েছে পিতৃতন্ত্রের এক স্বেচ্ছা লোলুপ ইতিহাস। সামন্ত যুগে স্ত্রী অধিকার ক্ষুণ্ন হবার ফলেই বিধাবা বিবাহ নিষিদ্ধ হয়। পরে হিন্দুরা ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে এটাকে প্রচণ্ড ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দাঁড় করে। এখানে মনে রাখতে হয় যে, এই আমৃত্যু বৈধ্য স্ত্রীর কোনো স্বেচ্ছা প্রণোদিত নিয়ম নয়; কারণ সামন্ত যুগে ধর্ম না হোক, সমাজ সর্বদাই বিধবা বিবাহের বিরোধী ছিল। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয় ভারতবর্ষের উচ্চকুলে মুসলমানদের মধ্যে বিধাবা বিবাহ এখন পর্যন্ত বর্জিত আছে। ক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করে পুরুষ নীতি ভেঙ্গেছে এবং নারীদের কুক্ষিগত করার জন্য সুবিধামত নীতি তৈরি করেছে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভাষায়, “মোঘল আমলে কয়েক পুরুষ ধরিয়া রাজ কুমারীদের অবিবাহিত থাকার রীতি ও চলিত ছিল; জানা যায় ওরঙ্গজেব সম্রাট হইবার পর এই রুঢ় প্রথা রহিত করিয়া দিয়াছিলেন।” (মানব সমাজ, ঢাকা : ১৪৩)
এরপর পিতৃতন্ত্রের প্রবহমান নৈতিকতায় ক্ষমতার দৌরাত্ম্য ক্রমশ এগিয়ে চলে। যেথা নারী পুতুলেরই অনুরূপ। পুরুষ তার ইচ্ছেমতোই নারীকে যেনো পরিচালনা করছে। যদিও কোথাও কোথাও এর ব্যতিক্রম রয়েছে। তবু ব্যতিক্রম উদাহরণ নয়। রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভাষায়, “স্ত্রীর অবস্থা সমাজে ক্রমেই খারাপ হইয়াছে, ক্রমেই তাহার মৌলিক অধিকারগুলি লুণ্ঠিত হইয়াছে এবং শেষে স্ত্রী পুরুষের সম্পত্তিতে পরিণত হইয়া গিয়াছে।” (মানব সমাজ, ঢাকা : ১৪৪) এখনো বিবাহিতা স্ত্রী পতির স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করতে সাহাস পায় না। কেবল গোপনে বিষেরগুটির মতো এই নির্মমতাকে কণ্ঠলীন করে নেয়। এর কারণ খুবই স্পষ্ট পিতৃতন্ত্রের সামজ কাঠামো এমন ভাবে তৈরি যে, স্ত্রীর স্বেচ্ছাচারে সমাজের নাক-কান কাটা যাবে আর পুরুষের ভ্রষ্টচারকে সমাজ ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়।
পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও নারীদের স্বাধীনতা নেই। পুরুষই নির্ধারণ করে দিয়েছে নারী কী পোশাক পরবে। দীর্ঘদিন ধরে নারীর অবদমিত হৃদয়ে পিতৃতান্ত্রিক প্রভাবে দাসীবৃত্তি মনোভাব ঠাঁয় করে নিয়েছে। নারীবাদী রোকেয়া বলেছেন, “আমাদের মন পর্যন্ত দাস হইয়া গিয়াছে।” (রোকেয়া রচনাবলি, ঢাকা : ১৭) তিনি আরো বলেন-“শরীর যেমন জড়পিন্ড, মন ততোধিক জড়। আমাদের শয়ন কক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না। বহুকাল হইতে নারী হৃদয়ের উচ্চ বৃত্তিগুলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায় নারীর অমত্মর, বাহির, মসিত্মষ্ক, হৃদয় সবই ‘দাসী’ হইয়া পড়িয়াছে। (রোকেয়া রচনাবলি, ঢাকা ২৫-২৬, ২৮)
তাই নারীর জন্য এই দাসীবৃত্তি মনোভাব পরিহার করা আবশ্যক। এ জন্য চাই স্বাতন্ত্র্যবোধ। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য, “‘স্বাতন্ত্র্য’ হবে অসামন্যতার প্রতীক। তার মনোভূমি হবে সৃজনশীল-নিত্য বাসন্তী হাওয়া বইবে তাতে। ভাঙ্গনে থাকবে তার বেদনাবোধ, গড়নে জাগবে উল্লাস।” (আহমদ শরীফ রচনাবলি, ঢাকা : ১৩৫)
নারীমুক্তির জন্য প্রয়োজন চিত্তের জাগরণ ও স্বাধীনতা। এ প্রসং্গে ড. আহমদ শরীফ বলেন :
তাই কালিক প্রহরে নারীমুক্তির জন্য প্রয়োজন স্বীয়চিত্তের জাগরণ, জীবনের জাগরণ। জীবনের যখন জাগরণ আসে, তখন মানুষ উন্মুক্ত হয়ে উঠে আত্মপ্রসারে। তখন তাজা প্রাণ ঘিরে থাকে সৃষ্টি সুখের উল্লাস ... তাই প্রগতি কিংবা অগ্রগতি আসলে মনেরই চিন্তা ভাবনার ফসল। (আহমদ শরীফ রচনাবলি, ঢাকা : ১২৩)
পুরুষের কামবৃত্তি প্রবল। অবশ্য নারীর ও যে নেই তা নয়। তবে পুরুষ শুধু নারীর যৌনকাম চরিতার্থ করার জন্যই নারীকে আবেগাকূলতায় কাছে টানে। আবেগে হয়ে পড়ে বিহ্বল। তখন তার থাকে না স্বীয়জ্ঞান-নৈতিকতা; থাকে না তখন পৃথিবীর অপর কোনো কিছুর সাথে তার সম্পর্ক কিংবা ভাবনা। এ প্রসঙ্গে টোকন ঠাকুরের একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি স্মরণযোগ্য :
...একজন নারীর মধ্যে সমুদ্র আছে, বন্দর আছে জাহাজও আছে।
আর অসংখ্য পুরুষ জাহাজের ডকে কম বেতনের গতরখাটা
খালাসি হয়ে মাসের পর মাস সমুদ্রে বসে থাকে।
বহুদিন সে তার বাড়িতেও ফেরে না।
(সমকাল, কালের খেয়া : ১০.১১.২০০৬)
নারীর পুরুষের তৈরি প্রথায় এখনো বন্দী। অসুস্থ ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা যেমন অসুস্থ থাকে, তেমনি প্রথায় বা শৃঙ্খলের গণ্ডিতে বেড়ে উঠা নারীর অন্তরও শৃঙ্খলিত থাকে। এমতাবস্থায় থাকে না তার স্বীয় অধিকার। অবশ্য, নারীরও যে স্বতন্ত্র্য সত্তা রয়েছে, তারও যে স্বীয় অধিকার প্রয়োজন, স্বাধীনতা প্রয়োজন, এমন চিন্তাও তার অবচেতনেই থেকে যায়। নারীর অধিকার নিয়ে একগোত্র পুরুষ উনিশ শতক থেকে লড়াই করছেন নারীর পক্ষে। তাদের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের রয়েছে সমান অধিকার। তাছাড়া নারী ও পুরুষের উভয়ের মূল পরিচয় হচ্ছে তারা মানুষ।
নারীবাদী রোকেয়ার চোখে ‘পুরুষ’ শব্দটিই ছিলো আপত্তিকর। তিনি পুরুষকে উপহাস করছেন, তাকে গণ্য করেছেন পশুর থেকেও নিকৃষ্ট রূপে। তিনি বলেন, ‘‘যদি স্বার্থপরতা, ধূর্ততা ও কপটাচরকে সদগুণ বলা যায়, তবে অবশ্য পুরুষজাতি কুকুরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।’’ (রোকেয়া রচনাবলি, ঢাকা : ১৭০) ‘স্বামী’ শব্দের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি বিস্তর উপমা টানেন। তাঁর ভাষায় : “পুরুষতন্ত্রের তৈরি এক ঐশি ভাবাদর্শ ‘স্বামী’ যা পুরুষকে উত্তীর্ণ করেছে নারীর বিধাতার স্তরে। ‘স্বামী’ তাঁর কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দ। তিনি প্রশ্ন করেছেন, শ্রীমতিগণ জীবনে চিরসঙ্গী, শ্রীমানদিগকে ‘স্বামী’ ভাববেন কেন? [রোকেয়া রচনাবলি, পৃ: ৪০] তিনি এ শব্দটি বাতিল করে প্রসত্মাব করেছেন একটি নতুন শব্দ : আশা করি এখন ‘স্বামী’ স্থলে ‘অর্ধাঙ্গী’ শব্দ প্রচলিত হইবে।” (রোকেয়া রচনাবলি, ঢাকা : ৪৪)
পূর্বেই বলেছি, পুরুষের তৈরি করা প্রথায় নারীরা এখনো বন্দী। আর সে প্রথায় নিমগ্ন হয়েই নারীরা অলঙ্কার পরে। নারীর অলঙ্কার নিয়ে ও রোকেয়া তীব্র পরিহাস করেছেন। তার মতে:
আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলি-এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ। এখন ইহা সৌন্দর্য বর্ধনের আশায় ব্যবহার করা হয় বটে; কিন্তু অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির মতে অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন (Originally badges of slavery) ছিল। তাই দেখা যায়, কারাগারে বন্দীগন পায়, লোহনির্মিত বেড়ী পরে, আমরা (আদরের জিনিস বলিয়া) স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি লৌহ নির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্য নির্মিত চুড়ি! কুকুরের গলে যে গলাবন্ধ দেখি, উহাদেরই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে। ... গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া ‘নাকাদড়ী’ পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের ‘নোলক’ পরাইয়াছেন! ঐ নোলক হইতেছে স্বামী’র অস্থিত্বের (সধবার) নিদর্শন! (রোকেয়া রচনাবলি, ঢাকা : ৪৪-৪৫)
তাঁর মুখেই আমরা শুনতে পাই নারী মুক্তির এক চরমবাণী-‘‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কর্মক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্য বস্ত্র উপার্জন করুক। আঠার শতকের এক বিপ্লবী নারীবাদী লেখিকা মেরি তার দুর্বল লিঙ্গীয় শ্রেণীর শরীর ও মনে শক্তি অর্জনের চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর এ ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস অফ ও ম্যান গ্রন্থে বলেন, “একমাত্র উপায়ে নারীরা পৃথিবীতে দাঁড়াতে পারে- বিয়ে ব’সে। এ-কামনা তাদের পশুতে পরিণত করে, যখন, তাদের বিয়ে হয় তখন তারা এমন আচরণ করে যা শুধু শিশুদের কাছেই আশা করা যায়-তারা সাজগোজ করে, তারা রং মাখে।”
শিক্ষার মাধ্যমে নারীর চিন্তাভাবনার প্রভূতি উন্নতি সম্ভব। নারীরা গৃহপরিবেশে পিতৃতন্ত্রের প্রবহমান ধারায় বেড়ে উঠে। তাদের পরনির্ভরশীলতার জন্য পুরো সমাজ ব্যবস্থা, সামাজিক কুসংস্কার ও অনগ্রসর মনোভাবই দায়ী। অশিক্ষা ও সমাজের রক্ষণশীল মনোভাবের কারণেই নারীরা আজ ও স্বাবলম্বী নয়। জীবন চলার পথে নারীদের মতামতের বিশেষ মূল্যায়ন করা হয় না বললেই চলে। পিতৃতন্ত্রের বিশ্বাস-তারা প্রয়োজনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যেমন-উদাহরণ সরূপ বলা যায়- ‘বিয়ে’। বিয়েতে সাধারণত গ্রামীণ অধিকাংশ মেয়েরই মতামতের মূল্যায়ন হয় না। শুধু গ্রাম নয়, শহরেও খুব স্বল্পাংশ মেয়েরই মতামতের মূল্যায়ন হয়; যা মোটের তুলনায় খুবই নগন্য। আজও কনে দেখার মানে তার রূপ, দেহের বাহ্যিক গঠন (দাঁত, কান, নাক, হাত, কেশ, সুগঠিত স্তন) পছন্দ করা। অনেকটা বাজারে ভাল গরু ক্রয়-বিক্রয়ের মতো ঘটনা আরকি!
বর্তমানে অবশ্য নারীদের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে। সফলতার সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সিদ্ধান্ত নিতে এবং প্রয়োজনে নেতৃত্ব দিতেও তাদের কর্মদক্ষতা আরও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতরো হচ্ছে। ইংল্যান্ডের মার্গারেট থেচার, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীলংকার শ্রীমাভো বন্দর নায়েক, বাংলাদেশের খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, নারী শিক্ষা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের নেত্রী বেগম রোকেয়া এবং পাকিস্থানের আসমা জাহাঙ্গীর এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
নারীদের সম্পর্কে এতকাল ধরে যে সমস্ত ভ্রান্ত ও কুসংস্কার সমাজে বদ্ধমূল হয়ে আছে তা একদিনে যেমন পরিবর্তন সম্ভব নয় তেমনি স্বল্পাংশের প্রচেষ্টায়ও তা দূরিভূত করা সম্ভব নয়। নারীর নিজের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে নিতে হবে নিজেকেই। পুরুষ তার ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করবে না। নারীর নিরস্কুস মুক্তি তখনই ঘটবে-যখন নারীর চেতনায় অনুভূত হবে : তাদের ভবিষ্যৎ মানুষ হওয়া, নারী হওয়া, নারী থাকা নয়।
,%20%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9C%20(Patriarchy),%20munshi-alim,%20munshi-academy.webp)
কোন মন্তব্য নেই