ইনসাফ (গল্প): মুনশি আলিমের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প
ইনসাফ (গল্প)-মুনশি আলিম
হাসপাতালে যাওয়ার জন্য সিএনজিতে উঠলাম। পেছনের আসনে আমরা দু’জন। তৃতীয় জনের জন্য অপেক্ষা। মিনিট চারেক পর। আনুমানিক প্রায় একশত বিশ কেজি বা তারও বেশি ওজনের এক বোরকা পরা রমণী এসে পেছনের খালি জায়গাটিতে বসল। রমণী বসার সঙ্গে সঙ্গেই সিএনজিটি একবার কেঁপে উঠল। আমার ডাইনের ভদ্রলোক মধ্যমপ্রকৃতির মোটা আর বামের জনের তো কথাই নেই! মাইনকার চিপায় পড়ার মতো অবস্থা! মহিলাকে যথেষ্ট পরিমাণ জায়গা দিতে আমাদের দুজনকেই বেশ বেগ পেতে হলো।
রমণীর সঙ্গে একটি বড়ো ব্যাগ ছিল। তিনি সুবিধামতো বসে ব্যাগটিকেও আমার এবং মহিলার মধ্যবর্তী আসনে রাখার নিরন্তর চেষ্টা করতে লাগলেন। রমণীর মতো তার ব্যাগটিও নানাবিধ দ্রব্যাদিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠেছে। খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংকোচে রমণীকে কিছু বলতে পারিনি। বিপদে পড়লে নাকি মানুষ বিষ খেয়েও বিষ হজম করে! এমনিতেই রমণীকে জায়গা দিতে আমাদের অনেক পেতে হয়েছে; তার ওপর আবার মহিলার গর্ভবতী ব্যাগের জায়গা দিতে আমাদের দুজনের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠল! ড্রাইভার লুকিং গ্লাসে দেখে মুচকি মুচকি হাসছেন।
ব্যাগের ভেতর কী একটা শক্তগোছের মতো জিনিস; আমার উরুতে লাগামাত্রই আমি উহ! শব্দ করলাম। সরে বসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। কেননা, পেছনে কিংবা ডান পাশে আর তিল পরিমাণ স্থানও শূন্য নেই। কী এক অজ্ঞাত কারণে সিএনজি ড্রাইভার হঠাৎ হার্ডব্রেক করলেন। নিজেকে সামলাতে গিয়ে আমার বাম হাতের কনুই ব্যাগের ওপর একটু লাগল। ওরে বাপরে বাপ! ঘাতের কনুই লাগামাত্রই মহিলা ঝড়ের বেগে ক্রোধে ফেটে পড়লেন। সেকি গালি! সেকি দুর্গন্ধযুক্ত ভাষা! এককথায় অশ্লীল শব্দের বৃষ্টি পড়ছে। আর সে বৃষ্টিতে আমি একাই ভিজতে লাগলাম। মনে হলো যেনো এক নিমিষেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে! মানুষের ধৈর্যেরও সীমা থাকে। সে সীমানা অতিক্রম করলে মানুষ আর স্বাভাবিক থাকতে পারে না! আমিও পারলাম না।
নিজের চোখমুখ ভয়ানক রকম শক্ত করে বললাম—আমি আত খানো রাখতাম? আসমানো রাখতাম নি? অত শুচিবায়ু লইয়া পাবলিক গাড়িত আইলায় খ্যানে? সিএনজি রিজার্ভ নিলানা খ্যানে? আর না অইলে রিকশাত এখলা গেলা না খ্যানে? ইনসাফ বিচার নাই খ্যানে? আফনার লাগি আমরা দুইজন কিলান ঠাসাঠাসি খরি বইছি; তারফর আবার আফনার লাখান আফনার পোয়াতি ব্যাগও মাঝখানো হারাইছইন! আফনে অত বিবেক ছাড়া খ্যানে? আমি আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার ডান পাশে বসা ভদ্রলোক আমাকে থামাইয়া বললেন—বাদ দেউক্কা ভাই, অউ তো আর আইচচি!
সিএনজির বাইরের দিকে তাকিয়ে শেষ বাক্যটিও তিনি বললেন—মাইনশে আইজখাইল ইনসাফবিচার ঘরো রাখিয়া আইন, লগে রাখোইন না!

কোন মন্তব্য নেই