ভোটের রাতে একা এক প্রহরী - মুনশি আলিম
ভোটের রাতে একা এক প্রহরী
মুনশি আলিম
ভোটের আগের দিন।
দায়িত্বের ভার যেন বুকের ভেতর পাথর হয়ে চেপে আছে। আমি তখন একটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার; নির্বাচনের সব দায়-দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
সকাল থেকেই ব্যস্ততা। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- সবার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ জরুরি। অথচ ভাগ্যের পরিহাস, মরতে মরতে আমার মোবাইলের মিনিটও শেষ! যোগাযোগবিহীন প্রিসাইডিং অফিসার মানে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রহরী।
হন্যে হয়ে ছুটলাম লোডের দোকানে। দোকানদাররা কেউ গড়িমসি করছে, কেউ ভান করছে নেটওয়ার্ক নেই। অবশেষে একজন মুখ ফসকে বলে ফেলল- ২০ টেখা বেশি দেওয়া লাগব।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আজ ভোটের আগের দিন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত মানুষজন দৌড়াচ্ছে। অথচ এই সামান্য সুযোগেও কেউ কেউ বাড়তি লাভের হিসাব কষছে!
নিরুপায় হয়ে ৩০ দিনের মিনিট কার্ড কিনে বেরিয়ে এলাম। ফিরতি পথে হাঁটতে হাঁটতে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল- এ দেশের মানুষ কি কোনোদিনই ভালো হবে না?
ভোটগ্রহণের দিন যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধ। কেন্দ্র খোলার আগে থেকে শেষ ভোট পড়া পর্যন্ত এক অদৃশ্য চাপ। কোনো কারণেই যেন কেন্দ্র বন্ধ না হয়- এই দুশ্চিন্তা মাথার ভেতর সারাক্ষণ বাজতে থাকে।
ভোট শেষ হওয়ার পর চাপ যেন জ্যামিতিক হারে বাড়ে। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফোন করছেন, অধস্তনরা পরামর্শ চাইছেন, এজেন্টরা প্রশ্ন তুলছেন, ভ্রাম্যমাণ টিম ঘুরে যাচ্ছে, আবার একইসঙ্গে সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের সম্মানীও বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে।
সবাই ব্যস্ত, সবাই উদ্বিগ্ন- কিন্তু কেন্দ্রের চূড়ান্ত দায়টা কেবল একজনের কাঁধেই।
ধারণা করি, এই সময়টাতে দেশের সব প্রিসাইডিং অফিসারই ভীষণ একা হয়ে যান।
ভোটের হিসাব, ফলাফল শিট, অঙ্কের খুঁটিনাটি- সবকিছুর মাঝে একটু কাটাকাটি হলেই সন্দেহের চোখ। যেন ভুল মানেই জালিয়াতি! কিন্তু কেউ কি জানে, সেই মুহূর্তে হাত কাঁপে ক্লান্তিতে, চোখ ঝাপসা হয় নির্ঘুমতায়?
রাত ঘনিয়ে এলো। দায়িত্ব শেষ করে ফলাফল জমা দিতে উপজেলা চত্বরে পৌঁছালাম। সেখানে মানুষের ঢল। তিলধারণেরও জায়গা নেই। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফলাফল জমা দিলাম। মনে হলো- এ যাত্রা মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়!
বেরিয়ে দেখি যাওয়ার মতো কোনো গাড়ি নেই। যা আছে, কানায় কানায় পূর্ণ। শেষমেশ এক সিএনজি পেলাম। ড্রাইভার ভাড়া বলল এমন, শুনলে বিদেশির হার্টস্ট্রোক হতে পারে। আমরা বাঙালি, তাই অবাক হই না; কেবল ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যাই।
১৫০ টাকার ভাড়া ৫৫০ টাকায় মেনে নিলাম। তাতেও তার শর্ত—রাস্তায় যাত্রী পেলে তুলবে। ভাবলাম- পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে!
দু রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি, শরীরকে প্রায় অসাড় করে ফেলেছে। বাড়ি পৌঁছালাম রাত বারোটায়। হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়তেই মনটা ভারী হয়ে উঠল।
লোডের দোকানদার, সিএনজি ড্রাইভার- তাদের তো সরকার বলেনি এমন অনৈতিক কাজ করতে। তবু তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনসাধারণকে জিম্মি করে বাড়তি সুবিধা নেয়। পান থেকে চুন খসলেই সরকারের দোষ। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে আমরা যেন দায় এড়িয়ে যাই।
কিন্তু প্রশ্নটা কি ভেতরে ভেতরে আমাদের দিকেই ফিরে আসে না? আমরা কি সত্যিই নিজেদের জায়গা থেকে সৎ? রাষ্ট্র মানে তো কেবল সরকার নয়; রাষ্ট্র মানে আমরা সবাই।
সেই রাতে চোখ বুজে ভাবছিলাম- নির্বাচন শুধু ভোটের নয়, চরিত্রেরও পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় আমরা কবে উত্তীর্ণ হব?
কবে মানুষ মানুষের প্রতি ন্যূনতম ন্যায্যতা দেখাবে? কবে দায়িত্ব শুধু চাকরি থাকবে না, বিবেকও হবে? হয়তো কোনো একদিন- যেদিন আমরা নিজেদের বদলাব, সেদিনই বদলাবে দেশ।
২১.০২.২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
শাহপরান, সিলেট
— অস্তিত্বের জ্যামিতি (সম্ভাব্য গল্পগ্রন্থ), লেখক: মুনশি আলিম

কোন মন্তব্য নেই