এস এম সুলতান:এক মহাবৈরাগী ও পেশিবহুল কৃষকের রূপকার
এস এম সুলতান: এক মহাবৈরাগী ও পেশিবহুল কৃষকের রূপকার
ভূমিকা: মেসোপটেমীয় সভ্যতার মতো শক্তিশালী এক প্রতিভা
শেখ মোহাম্মদ সুলতান, সংক্ষেপে এস এম সুলতান, ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলার মাসিমদিয়া গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল লাল মিয়া। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন ভবঘুরে এবং প্রকৃতিপ্রেমী। দারিদ্র্যের কারণে প্রথাগত শিক্ষা বেশিদূর না এগোলেও তাঁর প্রতিভার আলো ঠিকই ঠিকরে বেরিয়েছিল। ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চার দেয়ালের শৃঙ্খল তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। তিন বছর পর তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এক যাযাবর জীবন শুরু করেন, যা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি সুদূর ইউরোপ ও আমেরিকায়।
বাংলা চিত্রকলা ও নন্দনতত্ত্বের ইতিহাসে এস এম সুলতান এক রহস্যময় এবং বিস্ময়কর নাম। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যেখানে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছেন, সুলতান সেখানে আমাদের শিখিয়েছেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক আদিম ও অকৃত্রিম শক্তির আরাধনা। তাঁকে বলা হয় 'লালন শাহ'র পর বাংলার সবচেয়ে মরমী শিল্পী'। তিনি কোনো বাঁধাধরা নিয়মে চলেননি, বরং প্রকৃতির কোলে নিঃসঙ্গ থেকে সৃজন করেছেন এক অনন্য মহাকাব্য।
চিত্রদর্শনের মূল কথা: কেন পেশিবহুল কৃষক?
এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের দিকে তাকালে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো তাঁর ছবির কৃষকদের অস্বাভাবিক শারীরিক শক্তি। জীর্ণ-শীর্ণ অভাবী কৃষকের বদলে তিনি এঁকেছেন সুঠাম দেহী, পেশিবহুল ও বলবান মানুষ। এর পেছনে ছিল তাঁর গভীর জীবনদর্শন।
শক্তির আরাধনা: সুলতান বিশ্বাস করতেন, কৃষকই হলো এই পৃথিবীর প্রাণশক্তি। যারা লাঙ্গল চালায়, যারা ফসল ফলায়, তারা কখনও দুর্বল হতে পারে না। তিনি বলতেন, "আমাদের কৃষকেরা তো একদিন এমন শক্তিশালীই ছিল, শোষণের কবলে পড়ে তারা শীর্ণ হয়েছে।" তিনি তাঁর তুলির মাধ্যমে কৃষকদের সেই হারানো গৌরব ও শৌর্য ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
মাটির সাথে মানুষের যুদ্ধ: তাঁর বিখ্যাত ছবি 'চরদখল', 'প্রথম বৃক্ষরোপণ' বা 'ধান মাড়াই'—প্রতিটি কাজেই মানুষের পেশির সাথে মাটির বা প্রকৃতির এক লড়াই ফুটে ওঠে। সুলতানের আঁকা নারী চরিত্রগুলোও ছিল সবল ও কর্মঠ, যারা পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সৃষ্টির কাজ করে।
যাযাবর জীবন ও বিশ্বভ্রমণ
সুলতানের জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে ভ্রমণে। ১৯৫০-এর দশকে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। লখনৌ, শ্রীনগর, শিমলা থেকে শুরু করে প্যারিস ও নিউ ইয়র্ক—সবখানেই তিনি তাঁর তুলির জাদু দেখিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৫০ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি এবং অঁরি মাতিসের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের ছবির সাথে সুলতানের ছবিও প্রদর্শিত হয়েছিল। বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তিনি বিদেশের জৌলুস ত্যাগ করে ফিরে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় নড়াইলের নিভৃত পল্লীতে।
নড়াইলের ডাহুক ও শিশুস্বর্গ
সুলতান ছিলেন শিশুদের জন্য এক মমতাময়ী শিক্ষক। তিনি নড়াইলে তাঁর নিজের বাড়িতে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর জন্য গড়ে তুলেছিলেন 'শিশুস্বর্গ'। তিনি চাইতেন শিশুরা যেন প্রকৃতির মাঝে মুক্তভাবে বড় হয়। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি পশু-পাখির সাথে থাকতে ভালোবাসতেন; তাঁর বাড়িতে সবসময় সাপ, বাঁদর, বনবিড়াল আর হরেক রকমের পাখির আনাগোনা ছিল। তিনি যেন নিজেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলার এক লোকজ পুরাকথা।
শৈল্পিক কৌশল: নিজস্ব চট ও কয়লার ব্যবহার
সুলতান অনেক সময় প্রথাগত ক্যানভাস বা তেলরঙ ব্যবহার করতেন না। তিনি সাধারণ চটের বস্তাকে ক্যানভাস হিসেবে প্রস্তুত করতেন। রঙ তৈরির জন্য ব্যবহার করতেন প্রাকৃতিক উপাদান যেমন—কয়লা, ভুষো কালি কিংবা গাছের কষ। তাঁর রেখাগুলো ছিল মোটা এবং বলিষ্ঠ, যা ছবির বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রঙের ব্যবহারে তিনি মাটির রঙ বা 'আর্থ টোন' বেশি পছন্দ করতেন, যা তাঁর ছবিকে এক প্রকার প্রাচীন ও কালজয়ী আবহ দান করত।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
দীর্ঘদিন নিভৃতে থাকলেও শেষ বয়সে রাষ্ট্র তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়েছে। ১৯৮২ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট' সম্মাননা লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক প্রদান করে। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা লাভ করেন।
শাশ্বত বাংলার কবি
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই মহান শিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। এস এম সুলতান কেবল একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দ্রষ্টা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, আভিজাত্য বা নাগরিক বিলাসিতায় নয়, বরং মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যেই প্রকৃত সৌন্দর্য ও শক্তি লুকিয়ে আছে। সুলতানের ছবিগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মেহনতি মানুষেরাই এই পৃথিবীর প্রকৃত নায়ক।

কোন মন্তব্য নেই