তৈল প্রবন্ধের মূলভাব ও বিশ্লেষণ | হরপ্রসাদ শাস্ত্রী | ডিগ্রি
তৈল প্রবন্ধের মূলভাব ও বিশ্লেষণ | হরপ্রসাদ শাস্ত্রী | ডিগ্রি
তৈল প্রবন্ধের মূলভাব
প্রাবন্ধিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অত্যন্ত চতুরতার সাথে দেখিয়েছেন যে, মানবসমাজে টিকে থাকতে হলে বা উন্নতি করতে হলে কেবল গুণ বা বিদ্যা যথেষ্ট নয়; বরং অন্যকে তোষামোদ করা বা ‘তেল দেওয়া’ একটি অপরিহার্য কৌশল। তিনি হাস্যরসের ছলে প্রমাণ করেছেন যে, তৈলই হলো জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি, যা কঠিন কাজকে সহজ করে দেয় এবং শত্রুতা দূর করে মৈত্রীর বন্ধন তৈরি করে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ
তৈলের সর্বব্যাপী ক্ষমতা
লেখক প্রবন্ধের শুরুতেই তৈলকে একটি অজেয় শক্তি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। চাকা ঘোরানো থেকে শুরু করে কলকব্জা সচল রাখা—সবখানেই তৈল লাগে। ঠিক তেমনি, মানুষের সমাজ ও রাজনীতির চাকা সচল রাখতেও এই ‘মনস্তাত্ত্বিক তৈল’ বা তোষামোদের প্রয়োজন। লেখক কৌতুক করে বলেছেন, বিদ্যার চেয়ে তৈলের জোর অনেক বেশি। কারণ বিদ্যা অর্জনে অনেক পরিশ্রম লাগে, কিন্তু তেল দিয়ে অনায়াসেই বড় বড় পদ বা সুযোগ বাগিয়ে নেওয়া যায়।
তোষামোদ ও সামাজিক বাস্তবতা
শাস্ত্রী মশাই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দেখিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি তেল দিতে জানে না, তার হাজার গুণ থাকলেও সে সমাজে অবহেলিত থাকে। অন্যদিকে, যার কোনো যোগ্যতা নেই কিন্তু তেল দেওয়ার শিল্পে (Art of Flattery) পারদর্শী, সে খুব দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছে যায়। এটি তৎকালীন এবং বর্তমান সমাজের এক নগ্ন সত্য।
তৈল ব্যবহারের কৌশল
লেখক রসিকতা করে বলেছেন, তেল দেওয়ারও নির্দিষ্ট নিয়ম বা ব্যাকরণ আছে। সবাইকে একইভাবে তেল দেওয়া যায় না।
- উচ্চপদস্থদের জন্য: এক ধরনের সূক্ষ্ম তোষামোদ।
- সমমর্যাদার মানুষের জন্য: অন্য ধরনের কৌশল।
যিনি সময়, স্থান এবং পাত্রভেদে সঠিক পরিমাণে তেল প্রয়োগ করতে পারেন, তিনিই জীবনে সফল।
ব্যঙ্গ ও শ্লেষের ব্যবহার
এই প্রবন্ধটি পড়ার সময় মনে হতে পারে লেখক তেল দেওয়ার পক্ষেই কথা বলছেন, কিন্তু আসলে তিনি শ্লেষ বা Irony ব্যবহার করেছেন। তিনি সমাজের মেরুদণ্ডহীন মানুষদের কটাক্ষ করেছেন যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্যের উপাসনা করে। ‘তৈল’ এখানে চাটুকারিতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক।
প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ (Vocabulary)
|
শব্দ |
অর্থ ও তাৎপর্য |
|
অসাধ্যসাধন |
যা করা অত্যন্ত কঠিন, তৈল প্রয়োগে তা সহজ হয়। |
|
মনস্তাত্ত্বিক তৈল |
তোষামোদ বা চাটুকারিতা। |
|
বিদ্যার গৌরব |
পাণ্ডিত্যের অহংকার, যা তৈলের কাছে হার মানে। |
|
অপ্রতিহত |
যা কেউ বাধা দিতে পারে না (তৈলের ক্ষমতা)। |
|
পাত্রভেদে |
ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা আচরণ বা তোষামোদ। |
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই প্রবন্ধে সমাজতাত্ত্বিক এক সত্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন যে, তোষামোদপ্রবণ এই পৃথিবীতে প্রকৃত মেধার চেয়ে চাটুকারিতার জয়জয়কার বেশি। প্রবন্ধটি মূলত সমাজের ভণ্ডামি এবং পদলেহনকারী মানসিকতার ওপর এক চরম আঘাত।
কোন মন্তব্য নেই