নিমাই পিরের মাজার: জয়পুরহাটের এক আধ্যাত্মিক নিদর্শন
নিমাই পিরের মাজার: জয়পুরহাটের এক আধ্যাত্মিক নিদর্শন
![]() |
ছবি: নিমাই পিরের মাজার: জয়পুরহাট |
ভূমিকা
জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলায় অবস্থিত নিমাই পিরের মাজার এ অঞ্চলের এক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় স্থাপত্য। এটি মূলত সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির আদলে নির্মিত একটি মাজার বা সমাধি সৌধ। জনশ্রুতি আছে যে, নিমাই পির নামক এক কামেল দরবেশ এই স্থানে ইসলাম প্রচার করেছিলেন এবং পরবর্তীতে এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। যদিও তাঁর প্রকৃত নাম বা পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে, তবে স্থানীয়দের কাছে তিনি 'নিমাই পির' নামেই পরম শ্রদ্ধেয়। মাজারের প্রধান কক্ষটি বর্গাকার এবং এর ওপরে একটি বিশাল গম্বুজ রয়েছে, যা প্রাচীন বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। পোড়ামাটির ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত এই স্থাপনাটি কালের বিবর্তনে সংস্কার করা হলেও এর প্রাচীন আভিজাত্য এখনো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রতি বছর এখানে উরস শরীফ ও মেলা আয়োজিত হয়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো ভক্ত সমবেত হন।
কোথায় অবস্থিত?
এটি জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলা সদরের অদূরে অবস্থিত। জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৩-১৫ কিলোমিটার।
কেন যাবেন?
* আধ্যাত্মিক প্রশান্তি: একজন প্রাচীন সুফি সাধকের মাজার জিয়ারত ও শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য।
* প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শ: সুলতানি আমলের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী এবং গম্বুজ বিশিষ্ট মাজার দেখার জন্য।
* ইতিহাসের সন্ধান: এই অঞ্চলের প্রাচীন জনপদ ও ইসলাম প্রচারের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে।
কখন যাবেন?
বছরের যেকোনো সময় এখানে যাওয়া যায়। তবে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উরসের সময় গেলে লোকজ মেলার অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া অনুযায়ী শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক।
কীভাবে যাবেন / রুট (স্টেপ বাই স্টেপ)
১. ঢাকা থেকে: গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে সরাসরি জয়পুরহাট বা পাঁচবিবিগামী বাসে (হানিফ, শ্যামলী, এসআর ট্রাভেলস) চড়ে পাঁচবিবি নামতে হবে।
২. ট্রেনে: ঢাকা থেকে 'নীলসাগর', 'একতা' বা 'দ্রুতযান' এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সরাসরি পাঁচবিবি রেলওয়ে স্টেশনে নামা যায়।
৩. পাঁচবিবি থেকে: পাঁচবিবি রেলওয়ে স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা ইজিবাইকে করে মাত্র ১০-১৫ মিনিটে নিমাই পিরের মাজারে পৌঁছানো যায়।
কী দেখবেন?
* মূল মাজার ভবন: সুলতানি আমলের এক গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাচীন কক্ষ।
* স্থাপত্য কারুকাজ: প্রাচীন ইটের তৈরি দেয়াল ও গম্বুজের গঠন।
* সংলগ্ন মসজিদ: মাজারের পাশেই ইবাদতের জন্য একটি মসজিদ রয়েছে।
* পারিপার্শ্বিক পরিবেশ: মাজার চত্বরের প্রাচীন গাছপালা ও শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ।
খরচ
* প্রবেশ ফি: মাজারে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট বা ফি লাগে না।
* যাতায়াত: পাঁচবিবি শহর থেকে রিকশা বা ইজিবাইক ভাড়া মাত্র ২০-৪০ টাকা। জয়পুরহাট শহর থেকে সিএনজিতে এলে ৫০-৭০ টাকা খরচ হতে পারে।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা
* পরিবহন: ভ্যান, রিকশা এবং ইজিবাইক এখানকার প্রধান যাতায়াত মাধ্যম।
* খাবার: পাঁচবিবি বাজারে সাধারণ মানের কিছু হোটেল রয়েছে। তবে ভালো মানের খাবারের জন্য জয়পুরহাট শহরে আসা ভালো। সেখানকার 'হোটেল পৃথিবী' বা 'রেডিয়েন্ট' রেস্টুরেন্ট পর্যটকদের জন্য ভালো বিকল্প।
যোগাযোগ ও আবাসন ব্যবস্থা
* আবাসন: মাজার এলাকায় থাকার ব্যবস্থা নেই। পাঁচবিবিতে কিছু সাধারণ হোটেল থাকলেও পর্যটকদের জন্য জয়পুরহাট জেলা শহরে থাকাই সুবিধাজনক। সেখানে 'হোটেল পপি', 'হোটেল পৃথিবী' বা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো রয়েছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা
* যেহেতু এটি একটি ধর্মীয় স্থান, তাই শালীন পোশাক পরিধান করুন।
* মাজারের ভেতরে অযথা শোরগোল করবেন না এবং পবিত্রতা বজায় রাখুন।
* প্রাচীন স্থাপত্যের দেয়ালে কোনো কিছু লেখা বা স্ক্র্যাচ করা থেকে বিরত থাকুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
* পাথরঘাটা: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা, যা মাজারের কাছাকাছি অবস্থিত।
* লক্ষণপুর রাজবাড়ি: পাঁচবিবি উপজেলার আরেকটি ঐতিহাসিক স্থান।
* আছরাঙ্গা দিঘি ও নান্দাইল দিঘি।

কোন মন্তব্য নেই