মধ্যবিত্ত (ছোটোগল্প) - ছামিয়া আক্তার
মধ্যবিত্ত (ছোটোগল্প)
ছামিয়া আক্তার
আমাদের ছোট্ট সংসার। অভাব এখানে নিত্যদিনের অতিথি। আর স্বপ্নগুলো? এ যেন মাটির ঘরের কোণে যত্ন করে তুলে রাখা কয়েকটি রঙিন কাচের চুড়ি! সুন্দর, অথচ বড়ো ভঙ্গুর। চার ভাইবোনের হাসি, কান্না, ঝগড়া আর ছোটো ছোটো চাওয়া-পাওয়ায় আমাদের দিনগুলো কেটে যায়। সংসারে সচ্ছলতা নেই; তবু বেঁচে থাকার একটুখানি আনন্দ আছে। আর আছে ভালোভাবে পড়াশোনা করে একদিন ভাগ্য বদলে দেওয়ার গোপন প্রত্যাশা।
আমরা চার ভাইবোন— রামিছা, রাইশা, হাবিব আর খাদিজা। আমি রাইশা। বড়ো বোন রামিছা নবম শ্রেণিতে পড়ে, আমি অষ্টমে, হাবিব পঞ্চমে আর ছোট্ট খাদিজা প্রথম শ্রেণিতে। তবে খাদিজার স্কুলে যাওয়া হয় খুব কম। সংসারের অভাব-অনটন তাকে শৈশবেই যেন পড়াশোনার নিয়মিত ছন্দ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
বাবা বর্গা চাষ করেন। আমাদের সংসারে প্রাচুর্য নেই; কিন্তু একেবারে অভুক্তও থাকতে হয় না। মা গৃহিণী। সংসারের কাজের ফাঁকে হাঁস-মুরগি পালন করেন। হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে যে সামান্য টাকা আসে তা সংসারের খরচ মেটাতে বেশ কাজে লাগে। আমাদের ছোট্ট সংসারটা এভাবেই কোনোরকমে চলে। কখনো স্বস্তিতে, কখনো টানাপোড়েনে।
বড়ো আপা আর আমি একই বিদ্যালয়ে পড়ি। আমাদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে ২৬ মে। পরীক্ষার ফি দেওয়ার কথা বাবাকে বলেছিলাম। বাবা আশ্বাস দিয়েছিলেন- মাসের শেষে ধান বিক্রি করে টাকা দেবেন। সেই আশায় আমরা দুই বোন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। হাবিবের পরীক্ষা আমাদের পরে। তাই সে এখনো পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী নয়। আমরা নিজেদের পড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকি। পরীক্ষার আগে এক সপ্তাহ ছুটি পেয়ে মন দিয়ে পড়ার সুযোগ হলো।
প্রথম দিন আমার বাংলা পরীক্ষা আর বড়ো আপার ইংরেজি। বড়ো আপা লেখাপড়ায় আমার চেয়ে অনেক ভালো। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সে সরকারি বৃত্তিও পেয়েছিল। আপাকে নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন! বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে বড়ো আপার সাফল্য যেন এক টুকরো আশার আলো।
পরীক্ষার দিন সকালে অল্প একটু ভাত খেয়ে পড়তে বসলাম। পরীক্ষা শুরু হবে সাড়ে দশটায়। দশটা দশে বই বন্ধ করে বিদ্যালয়ের পোশাক পরে বড়ো আপার সঙ্গে রওনা হলাম। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যেতে পনেরো মিনিটের মতো লাগে।
বিদ্যালয়ে পৌঁছে আমরা নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে বসলাম। রহমান স্যার ও রফিক স্যার খাতা দিয়ে গেলেন। লিখতে শুরু করেছি মাত্র। পরীক্ষাও বেশ সহজ মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ভালোভাবেই পরীক্ষা শেষ করতে পারব।
এমন সময় প্রধান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এলেন। তাঁর হাতে বেতন আদায়ের খাতা। খাতা দেখতে দেখতে তিনি আমাকে, ছায়মা, সারমিন, সামি ও রফিককে দাঁড়াতে বললেন।
—পরীক্ষার ফি দাওনি কেন?
ছায়মা বলল— স্যার, বাবা এখনো টাকা পাঠাননি।
সামি বলল —স্যার, কাল দিয়ে দেব।
এরপর আমার দিকে তাকিয়ে তিনি একই প্রশ্ন করলেন। আমি কিছু বলতে পারলাম না। গলা শুকিয়ে এল। আমতা আমতা করে কী যেন বলতে চাইলাম; কিন্তু শব্দগুলো মুখে আটকে গেল। রফিক কিছু বলার চেষ্টা করতেই প্রধান শিক্ষক চিৎকার করে উঠলেন— পাঁচজনই বেরিয়ে যাও আমার ক্লাস থেকে!
আমরা কেউ আর কোনো কথা বললাম না। মাথা নিচু করে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম। হাতে পরীক্ষার খাতা, অথচ তাতে কিছু লেখার সুযোগও হলো না। যে স্বপ্ন নিয়ে সকালে বিদ্যালয়ে এসেছিলাম, কয়েক মুহূর্তেই তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
বাইরে এসে দেখি, বড় আপাও শ্রেণিকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম— আপা, তুমি এখানে কেন?
আপা মলিন মুখে বলল— মানিক স্যার পরীক্ষার ফি দিতে পারিনি বলে আমাকে বের করে দিয়েছেন।
দুই বোন পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। আমাদের কারও মুখে কোনো কথা নেই। পথটা সেদিন যেন অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। বাড়ি ফিরে মাকে সব খুলে বললাম। মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বললেন— তোদের বাবাকে সন্ধ্যায় বলব।
সন্ধ্যায় বাবা বাড়ি ফিরলে বড় আপা সব কথা খুলে বলল। বাবা নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, তিনিও যেন কোনো অদৃশ্য বোঝার নিচে চাপা পড়ে আছেন।
কিছুক্ষণ পর বাবা বললেন— আমার কাছে যা টাকা আছে তা দিয়ে চাল, ডাল আর সবজি কিনতে হবে। এবার আর পরীক্ষা দিস না।
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। কিন্তু কিছু বললাম না। বড়ো আপা চেয়ারে বসে রইল। তার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চোখে জল চিকচিক করছিল কি না ঠিক বুঝতে পারিনি। শুধু দেখেছিলাম— সে মাথা নিচু করে আছে।
আমাদের আর পরীক্ষা দেওয়া হলো না। অন্যরা যখন পরীক্ষার ফল নিয়ে ব্যস্ত আমরা তখন নীরবে মেনে নিলাম নিজেদের পরাজয়। পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল; কিন্তু আমাদের ভেতরের পরীক্ষা যেন তখনই শুরু হলো।
কয়েক দিন পর বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। রফিক স্যার আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন—রাইশা, তুমি পরীক্ষা দিলে না কেন?
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। কী বলব তাঁকে? বলব- আমাদের সংসারে চাল-ডাল কেনার টাকা থাকলেও পরীক্ষার ফি দেওয়ার টাকা ছিল না? বলব- অভাবের কাছে আমাদের পড়াশোনার স্বপ্ন হেরে গেছে?
আমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছু কিছু দুঃখ আছে যা মুখে বলা যায় না।
দিন গড়িয়ে গেল। বর্ষা পেরিয়ে অগ্রহায়ণ এল। মাঠের ধান কেটে বাবা বাড়িতে নিয়ে এলেন। মা, বড়ো আপা আর আমি মিলে উঠানে ধান শুকাতে দিলাম। সোনালি ধানের ওপর রোদ পড়ে ঝিলমিল করছিল। সেই ধান দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের সংসারেও বুঝি এবার একটু স্বস্তি ফিরবে।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমরা বিদ্যালয়ে যেতাম। সন্ধ্যায় পড়তে বসতাম। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা তখনো মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। বই খুললেই মনে হতো অক্ষরগুলো আমাদের ডাকছে। আমরা কি আর কোনো দিন সেই ডাকের উত্তর দিতে পারব না?
হঠাৎ এক সকালে বাবা বললেন— তোরা দুজন আজ থেকে আর স্কুলে যাবি না।
বড় আপা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল— কেন বাবা?
বাবা ক্লান্ত গলায় বললেন— তোদের পড়াশোনার খরচ আর চালাতে পারছি না।
কথাটা শুনে আমাদের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট রাগ হয়ে বেরিয়ে এল। সেদিন আমরা আর বিদ্যালয়ে গেলাম না। কিন্তু সেই রাগের আড়ালে যে কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে ছিল তা বাবা বুঝতে পেরেছিলেন কি না জানি না।
সেদিন সন্ধ্যার পর বাবাকে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে শুনলাম। আমি আর বড়ো আপা চুপিচুপি দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বাবা বলছিলেন— সেলিম চাচা একটা ভালো পাত্রের সন্ধান দিয়েছে। ছেলে বিদেশে থাকে। রামিছাকে বিয়ে দিয়ে দিলে একটা দায়িত্ব কমে।
মা ধীর গলায় বললেন— রামিছার বয়স তো মাত্র পনেরো। এখনই বিয়ে দেবে কীভাবে?
বাবা যেন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পেলেন।
—আরে, মেম্বারকে কিছু টাকা দিলে বয়স বাড়িয়ে নেওয়া যাবে। সেলিম চাচা বলেছে, পাত্র ভালো।
মা আর কিছু বললেন না। একটু পরে শুধু বললেন— আচ্ছা।
তারপর বাবা আবার বললেন—হাবিবকেও একটা ওয়ার্কশপে দিয়ে দেব। কাজ শিখবে, কিছু টাকা রোজগার করবে। আমার ওপর থেকেও চাপ কমবে।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো পৃথিবীটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বড়ো আপার দিকে তাকালাম। তার চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমার চোখও ঝাপসা হয়ে গেল।
যে আপা একদিন সরকারি বৃত্তি পেয়েছিল যে আপাকে নিয়ে আমাদের কত আশা ছিল। আর সেই আপার ভবিষ্যৎ আজ কয়েকটি টাকার অভাবে অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। আর হাবিব- যে এখনো শৈশবের গণ্ডি পেরোয়নি, তাকে পাঠানো হবে ওয়ার্কশপে।
আমরা কেউ কাঁদতেও পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমাদের চোখের জলটুকুও যেন সংসারের অভাবের কাছে বন্ধক রাখা।
বাইরে তখন শীতের রাত। দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছিল শিশুর পড়ার শব্দ। বড়ো আপা আমার হাত শক্ত করে ধরল। তার হাত কাঁপছিল। আমি জানতাম- সে কিছু বলতে চায়। আমিও বলতে চাইছিলাম অনেক কিছু। কিন্তু আমাদের কণ্ঠে কোনো শব্দ এল না।
সেদিন প্রথম বুঝলাম- অভাব মানুষের পেটের ক্ষুধার পাশাপাশি মানুষের স্বপ্নও কেড়ে নেয়। শৈশব থামিয়ে দেয়, সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেয়। কখনো কখনো অভাবের কাছে হার মানতে মানতে একটি পরিবার নিজের অজান্তেই তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে দেয়।
আমাদের সংসারে কেউ বিলাসিতা চায়নি। আমরা শুধু পড়তে চেয়েছিলাম। বড়ো আপা শিক্ষক হতে চেয়েছিল আর আমি চেয়েছিলাম নিজের পায়ে দাঁড়াতে। সেই স্বপ্নগুলো কি খুব বেশি বড়ো ছিল?
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা দুই বোন নীরবে কাঁদছিলাম। ঘরের ভেতরে বাবা-মায়ের কথাবার্তা থেমে গেছে। বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছে।
আর আমাদের ছোট্ট জীবনের ওপর নেমে আসছে মধ্যবিত্তের চিরচেনা অন্ধকার! যেখানে স্বপ্ন থাকে, সাধ থাকে, সম্ভাবনাও থাকে; শুধু সেগুলো পূরণ করার সামর্থ্যটুকু থাকে না।
১০.১১.২০২৬
জকিগঞ্জ, সিলেট

🥹🖤golpo ta onk real mone holo kno jani
উত্তরমুছুনআপনার মূল্যবান মতামতের জন্য অনেক ধন্যবাদ। ভালোবাসা জানবেন।
উত্তরমুছুন