আপন আলোয় উদ্ভাসিত শিল্পসাহিত্যের ছোটোকাগজ চৌহাট্টা। মুনশি আলিম।মুনশি একাডেমি
আপন আলোয় উদ্ভাসিত শিল্পসাহিত্যের ছোটোকাগজ চৌহাট্টা
মুনশি আলিম
চৌহাট্টা শিল্পসাহিত্যের ছোটোকাগজ। তিন ফর্মার এই ছোটোকাগজটিতে রয়েছে নতুন চমক। প্রকরণ, বিন্যাস, মানের ও গুণের দিক থেকে প্রথম সংখ্যাতেই চেষ্টা করা হয়েছে বৈচিত্র্য আনার। বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধকরণে যেমন সৃষ্টিশীল ব্যক্তির ভ‚মিকাকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয় তেমনি লেখক সৃষ্টির কারিগর হিসেবে সাহিত্যের ছোটকাগজগুলোকেও প্রায় সমদৃষ্টিতে দেখা হয়ে থাকে। মূলত ছোটোকাগজ হচ্ছে সাহিত্যের পাঠশালা। পাঠশালাতে যেমন আমরা ধ্বনি, বর্ণ, শব্দগঠন, বাক্যগঠন শিখি তেমনি ছোটোকাগজের মাধ্যমেও সাহিত্যের পাঠশালার কাজ স¤পাদন করা হয়ে থাকে। তাছাড়া ছোটোকাগজে থাকে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর রুচির প্রকাশ। এতে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় প্রবীণ লেখকের সাথে নবীন লেখকের। এতে করে লেখকদের মধ্যে যেমন ভাবের মিথস্ক্রিয়া ঘটে তেমনি ঘটে রুচির পরিবর্তন।
১৪২৩ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে উন্মেষ ঘটেছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ছোটোকাগজ চৌহাট্টা’র। মূলত এ উন্মেষের নেপথ্যে রয়েছে নতুন লেখক সৃষ্টির দৃঢ় প্রত্যয় এবং সেই সাথে নিজেদের সৃষ্টিশীলতাকে বিশ্বসাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্য।
ছোটোকাগজটিতে মোট ছয়টি বিভাগ রয়েছে। মুক্তগদ্য, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, শিল্প-ভাবনা, পাঠপ্রতিক্রিয়া প্রভৃতি। নির্ঝর নৈঃশব্দ্য’র সরস গদ্যের কাব্যিক ঢং চৌহাট্টাকে ঋদ্ধ করেছে। শব্দ বুননে চমক এনেছেন মেঘ অদিতি ও শ্বেতা শতাব্দী এষ। বেশ ঝরঝরে গদ্য। পাঠক হৃদয় স্পর্শ করার মতো সকল গুণই রয়েছে কবিতাদ্বয়ে। অনুভূতির সমুদ্রে-স্নান করা কাব্যিক স্মৃতিচারণায় কাজী যুবাইর মাহমুদ’র রয়েছে বেশ মুনশিয়ানার ছাপ।
বাংলাদেশের পুথি সাহিত্য নামক প্রবন্ধে মুনশি আলিম তুলে এনেছেন পুথিসাহিত্যের আদি-অন্ত। তাঁর গোছালো আলোচনা চৌহাট্টায় বৈচিত্র্য এনেছে নিঃসন্দেহে।
কবিতার কলাবাগান সমৃদ্ধ করেছেন গুণী কবিবর্গ। নির্মলেন্দু গুণ, মুজিব ইরম, মাজুল হাসান, সুমন আখন্দ, রাসেল রায়হান, পলিয়ার ওয়াহিদ, জব্বার আল নাঈম, আজিম হিয়া, তানভীর এনায়েত, সারাজাত সৌম, হাসান রোবায়েত, মুহাম্মাদ রাইহান, নাওয়াজ মারজান, হুসাইন মুহাম্মদ ফাহিম, মহসিন চৌধুরী জয়, কানিজ মাহমুদ, মীম হুসাইন, ফারহানা ইলিয়াস তুলি, হোসাইন সোহাগ, আফসারা মীম, সতেজ মাহমুদ, সুমি সৈয়দা, মিসির হাসনাইন, সরফরাজ হাদী, সাইয়্যেদ মুজাদ্দিদ প্রমুখ।
মূলত ছোটোকাগজের নৈর্ব্যক্তিক অভিব্যক্তিই শিল্প-সাহিত্যের মূল ভিত্তি। সম্পাদকের মননশীল প্রচেষ্টা আর সৎ মনোভাবের প্রয়োগে সাহিত্য-উত্তীর্ণ কাগজ পরিচিতি পায়। ছোটোকাগজ সাহিত্যের সকল শাখাকেই সমানভাবে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। যদিও অনেক সময়ই নানাবিধ কারণে তা শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। তবু সম্পাদকমণ্ডলীদের চেষ্টার ত্রুটি থাকে না বললেই চলে। নাওয়াজ মারজান অত্যন্ত সতর্কতার সাথেই চৌহাট্টা’র প্রথম সংখ্যাটির সম্পাদনার কাজ করেছেন। সহযোগী সম্পাদক হিসেবে হুসাইন মুহাম্মদ ফাহিম এবং আবদুল আলিম হাদী’র ভূমিকাও নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
সৈয়দ মবনু, বাশিরুল আমিন, সায়ন্তনী বসু চৌধুরী, ফাহমিদা ফাম্মী প্রমুখ গল্পের বুননে যেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন তেমনি বিষয়বস্তুতেও এনেছেন নতুনত্ব। এককথায় চৌহাট্টায় প্রকাশিত গল্পগুলোতে রয়েছে ভিন্ন ধরনের আমেজ; যা পাঠককে শুধু বিনোদনই নয়, ভাবনার জগৎকেও শানিত করবে।
সোহেল প্রণন’র চারটি শিল্পসৌকর্য ও তার কাব্যিক ক্যানভাস চৌহাট্টাকে দিয়েছে ভিন্নধরনের স্বাদ, ভিন্নধরনের ব্যঞ্জনা। সাম্য রাইয়ান কবিতায় সংযোজন করতে চেয়েছেন একেবারেই নতুন থিম, নতুন প্রকরণ, নতুন ভাবধারার ব্যঞ্জনা!
চৌহাট্টায় প্রকাশিত রচনাসম্ভার পাঠককুলের প্রয়োজন মেটালে স¤পাদক সার্থক হবেন; যা কিনা বহুদূর হেঁটে যাওয়ার ইঙ্গিত মাত্র। যেকোনো কাগজের প্রকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা চাই-সব কাগজের প্রকাশ মহাকালের পথে হেঁটে যাক। তাহলে যেমন সাহিত্যের নতুন লেখক সৃষ্টি হবে, তেমনি সেই নতুন লেখক কর্তৃক সাহিত্যের বাঁকও পরিবর্তন ঘটবে। চৌহাট্টা সনাতন রুচির পরিবর্তন ঘটাক, বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধতা দানে এগিয়ে চলুক।

কোন মন্তব্য নেই