শূন্যতার কারিগর (গল্প) -মুনশি আলিম
রেলস্টেশন পেরিয়ে বন্দরের দিকে হাঁটছিলাম। দুপুরের রোদ যেন আগুনের চাদর মেলে রেখেছে শহরের গায়ে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও একটি খালি রিকশা বা সিএনজি পেলাম না। অগত্যা পায়ের ওপর ভরসা রেখে এগোতে লাগলাম।
কিছুদূর যেতেই রাস্তার ডানদিকে ছোটো ছোটো জটলা চোখে পড়ল। কৌতূহল মানুষকে যেমন টানে, আমাকেও টানল। কাছে যেতেই দেখি, মাটির ওপর ছেঁড়া পাটের বস্তা পেতে দুজন লোক তাস দিয়ে বাজি খেলছে। তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আরও দুজন; চোখে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস, মুখে অকারণ আত্মবিশ্বাস। একের পর এক বাজিতে তারা জিতে যাচ্ছে। দূর থেকেও সে জয়ের উচ্ছ্বাস ভেসে আসছে।
আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখতে দেখতে কখন যে দর্শক থেকে অংশগ্রহণকারীর সীমানায় চলে এলাম, নিজেই বুঝিনি। আমরা একে বলি জুয়া; যখন গলির মোড়ে নিম্নবিত্তের হাত ঘুরে টাকা যায়। আর পাঁচতারা আলোর নিচে, কাঁচের দরজার আড়ালে এর নাম হয়ে যায় ক্যাসিনো। নাম বদলায়, আলো বদলায়, পোশাক বদলায়, কিন্তু লোভের রং বদলায় না।
একজন জম্পেশ ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তার কণ্ঠে মধু, কথায় আশ্বাসের কোমল পরশ।
“আপনি ঐ কোটে টাকা ধরুন।”
তিনি বললেন এমন ভঙ্গিতে যেন আমার ভবিষ্যৎ তার হাতের তালুতেই লেখা। আমি ভাবিনি। ভাবার সময়ও পাইনি। অদ্ভুত এক সম্মোহনী টানে টাকা বাড়িয়ে দিলাম।
তিনি এমনভাবে বোঝাতে লাগলেন যে, মনে হলো- জয় আমার নিশ্চিত। হয়তো এভাবেই মানুষ স্বপ্নে বিশ্বাস করে মরুভূমিতে মরীচিকাকে জল ভাবে। কিন্তু ফলাফল এলো নিঃশব্দে। আমি হেরে গেলাম। মন খারাপ হলো। কিন্তু তিনি সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বললেন-
“এটাতে ধরবেন না, ভালো করে দেখুন, তারপর ধরুন।”
চারপাশে অন্য চারজন তখনও জিতে যাচ্ছে। তাদের হাসি যেন আমার ভেতরের সংশয়কে ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে। তৃতীয়বার তিনি বললেন-
“এবার ঐ কোটে রাখুন। তিনগুণ পাবেন।”
আমি শিশুর মতো অনুসরণ করলাম। মনে মনে স্রষ্টাকে স্মরণ করলাম। অদ্ভুত! মানুষ পাপের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও স্রষ্টার নাম নেয়; সম্ভবত আশীর্বাদ চেয়ে নয়, নিজের অপরাধকে নীরবে বৈধতা দিতে।
আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম তাসের কোঅর্ডিনেটরের দিকে। তিনগুণ টাকা পেলে কী কী করব, মনের ভেতর ছোটো ছোটো স্বপ্নের তালিকা বানিয়ে ফেললাম। কিন্তু হায়! স্বপ্ন ভাঙার শব্দ খুব জোরে শোনা যায় না। আমি আবারও হারলাম।
মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু কেমন অবাস্তব লাগতে লাগল। যেন স্বপ্ন দেখছিলাম। আর হঠাৎ কেউ আমাকে ঝাঁকিয়ে জাগিয়ে দিয়েছে। দুই মিনিট। মাত্র দুই মিনিটে আমার পুরো বাসা ভাড়ার টাকা উধাও। ভাবা যায়? আহা!
আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। তিনি আগের মতোই শান্ত নিরুত্তাপ গলায় বললেন-
“হতাশ হবেন না। আবার খেলুন। এবার বেশি রাখুন, সব উঠে আসবে।”
এই ‘উঠে আসবে’শব্দ দুটোই সবচেয়ে বিপজ্জনক। লোভ কখনো বলে না-“ থামুন।” সে শুধু বলে- “আরেকবার।”
বাইরে প্রচণ্ড রোদ। কিন্তু আমার ঘাম রোদের জন্য নয়। মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই প্রশ্ন- পরবর্তী মাসে বাসা ভাড়া দেব কীভাবে? হঠাৎ মনে হলো, এটা কি লাভের মোহ? নাকি নিছক লোভ? নাকি নিখুঁত সাজানো এক প্রতারণা নামক সম্মোহনের অভিনয়?
আমি কপালের ঘাম মুছতে মুছতে সেখান থেকে সরে এলাম। পেছনে রইল তাসের শব্দ, কৃত্রিম হাসি আর সাজানো জয়ের অভিনয়। ফিরতি পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল- আমি যেন নিজের কাছেই পরাজিত।
তপ্ত রোদ্দুরের নীরবতা ভেঙে অদূরে একটি চিল ডেকে উঠল। সেই ডাক যেন আকাশের ভেতর দিয়ে উঠে গেল। আর আমার বুকের গভীরে নেমে এলো এক অদ্ভুত শূন্যতা। হতাশার করুণ গালিচায় ডিগবাজি খেতে খেতে বুঝলাম- জুয়া কেবল টাকা কেড়ে নেয় না; সে মানুষের ভেতরের সরল বিশ্বাসটুকুও নিঃশব্দে চুরি করে নেয়।
২৩.০২.২০২৬
শাহপরান, সিলেট
— অস্তিত্বের জ্যামিতি (সম্ভাব্য গল্পগ্রন্থ), লেখক: মুনশি আলিম

কোন মন্তব্য নেই