পথের কি আর শেষ আছে? - মুনশি আলিম
পথের কি আর শেষ আছে? (গল্প)
মুনশি আলিম
পথের কি আর শেষ আছে?
প্রযুক্তির ঝকঝকে দুনিয়ায় আমার প্রবেশটা ছিল কিছুটা আড়ষ্ট। প্রথম ল্যাপটপ কেনার আনন্দটা ডেক্সটপের চেনা ছক ছাপিয়ে এক নতুন অভিজ্ঞতার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তখনো এর চাবিগুলোর (Keys) বিন্যাস আমার আঙুলের ডগায় বশ মানেনি। কী-প্যাডের গোলকধাঁধায় আমি তখনো এক নবিস অভিযাত্রী। তবে যতটুকু আয়ত্তে ছিল, তাতে আমার দিব্যি চলে যাচ্ছিল।
বিপত্তিটা ঘটল হুট করেই। একদিন দেখি ল্যাপটপের মাউস প্যাড বা টাচপ্যাডটি পাথরের মতো অচল হয়ে আছে। আঙুলের কোনো ইশারাই সে আর বুঝছে না। কতবার যে বৃথা চেষ্টায় আঙুল ঘষলাম, রিবোট (অন-অফ) করলাম- তার ইয়ত্তা নেই!
মনে মনে নিশ্চিত হলাম, এর পেছনে আমার চার বছর বয়সি ছেলে নাবহান আলভি মুক্তর কারসাজি আছে। ল্যাপটপ দেখলেই ওর ছোট্ট আঙুলগুলো পিয়ানোর রিডের মতো কী-বোর্ডের ওপর নেচে উঠত। অবুঝ শিশুর কৌতূহলী টিপাটিপিই যে এই যান্ত্রিক স্থবিরতার কারণ এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল না।
ভেতরটা জ্বলে উঠছিল। একটা কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে ওর ওপর খানিকটা রাগও দেখালাম। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, চার বছরের একটা শিশুর অপরাধই বা কী? ওর কাছে তো এই যন্ত্রটা কেবল এক আশ্চর্য খেলনা। অগত্যা একরাশ মনক্ষুণ্ণতা আর বিরক্তি নিয়ে একটা আলাদা মাউস সংযোগ দিয়ে কাজ চালাতে শুরু করলাম। ভাবলাম, আমার প্রিয় যন্ত্রটা বোধহয় স্থায়ীভাবেই বিকল হলো।
ঘটনার কয়েকদিন পর। এক মেঘমুক্ত শান্ত সন্ধ্যা। হঠাৎ মুক্ত দৌড়ে এল আমার কাছে। ওর ডাগর ডাগর চোখে তখন নক্ষত্রের মতো আনন্দের ঝিলিক! আমি কিছু বলার আগেই ও উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল- “আব্বু, আব্বু! মাউস ঠিক হয়ে গেছে!”
আমি বড়ো বড়ো চোখে বিস্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকালাম। অবিশ্বাস্য মনে হলো ওর কথা। ও প্রায় টেনে হিঁচড়ে আমাকে রিডিং রুমে নিয়ে গেল। ল্যাপটপের সামনে দাঁড়িয়ে ওর ছোট্ট আঙুল দিয়ে একটা বিশেষ কি (Key) দেখিয়ে বলল- “এই দেখো আব্বু, এখানে চাপ দিলেই মাউস প্যাড চালু হয়। আবার এটা চাপ দিলেই বন্ধ হয়!”
মুহূর্তেই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। যে সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমি আধুনিক প্রযুক্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম; আমার চার বছরের ‘অপরাধী’ পুত্রটি অবলীলায় সেই রহস্যের চাবিকাঠি আমার হাতে তুলে দিল! আহা! আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে।
মনে পড়ে গেল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের সেই চিরায়ত অমোঘ উক্তি- “পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া কহে—পথের কি আর শেষ আছে?”
আমার মনে হলো, শেখার পথটাও ঠিক তেমনই অন্তহীন। কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা ডিগ্রির ফ্রেমে একে বেঁধে রাখা যায় না। অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে বসে থাকা বাবার কাছে ওই একরত্তি শিশুই সেদিন হয়ে উঠল এক পরম শিক্ষক। জীবন আমাদের প্রতি কদমে কদমে শেখায়। আমরা যাকে আমাদের ভুল বা বাধা মনে করি, কখনো কখনো সেই আমাদের প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু খুলে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে আসে।
১৯.০২.২০২৬
শাহপরান, সিলেট, বাংলাদেশ
— অস্তিত্বের জ্যামিতি (সম্ভাব্য গল্পগ্রন্থ), লেখক: মুনশি আলিম

কোন মন্তব্য নেই