কুয়াশার বুকে শূন্য দৃষ্টি - মুনশি আলিম
কুয়াশার বুকে শূন্য দৃষ্টি
মুনশি আলিম
সিলেটের শাহপরান এলাকায় তখনো রাতের আঁধার পুরোপুরি কাটেনি। মধ্যরাতের সেই নিস্তব্ধ প্রহরে ইমাম সাহেবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল। এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন তাঁর অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। ঘামভেজা শরীরে তিনি যখন হকচকিয়ে জেগে উঠলেন; তখন চারপাশটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। ভয়টাকে একটু প্রশমিত করার আশায় অবশ হাতে পাশে থাকা মোবাইলটার টর্চ জ্বালালেন। বিছানা ছেড়ে নামার জন্য ছটফট করলেন তিনি। কিন্তু শরীরটা যেন তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। এক অদ্ভুত জমাটবাঁধা অসাড়তা তাঁর প্রতিটি রক্তবিন্দুতে মিশে গেছে। নির্জীব শরীরে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। যেন সময়ের চাকা থমকে গেছে। সেই রাতের বাকিটা সময় আর চোখের পাতা এক হলো না; একরাশ অস্বস্তি নিয়ে কেবল এপাশ-ওপাশ করলেন।
দূরের কোনো এক মিনার থেকে যখন ফজরের আজানের সুর ভেসে এল, ইমাম সাহেব তখন কায়ক্লেশে উঠে দাঁড়ালেন। শরীরে অদ্ভুত এক ক্লান্তি লেগে আছে। লাইট জ্বালিয়ে মোয়াজ্জিনকে ডেকে তুলে জামাতে নামাজ শেষ করলেন। নামাজের পর কোরান তিলাওয়াতে নিমগ্ন হলেন। সুরের মূর্ছনায় মনটা তখন কিছুটা শান্ত হতে শুরু করল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল অন্যভাবে। এক পাহাড়সম ঘুম তাঁর দুচোখ জুড়ে নেমে এল। একটু বিশ্রামের আশায় তিলাওয়াত শেষ করে ক্লান্ত শরীরে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন।
কিন্তু রুমে প্রবেশ করতেই তাঁর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। চারদিকে শূন্যতা। হাহাকারে তার হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে গেল। শেষটায় আর চেপে রাখতে পারলেন না। চিৎকার দিয়ে উঠলেন তিনি, মোবাইলখান কানো? মানিব্যাগটাও তো পাইরাম না!
বিছানার চাদর, বালিশ, এমনকি খাটের নিচে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন তিনি। মসজিদের প্রতিটি কোণে পাগলের মতো হন্যে হয়ে খুঁজলেন। না, কিছুই খুজে পেলেন না। তখন লজ্জার মায়া ত্যাগ করে পরিচিতজনদেরও জানালেন। কিন্তু সবাই কেবল নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাসই উপহার দিল।
মসজিদের উপরতলার চিলেকোঠায় ইমাম আর মোয়াজ্জিন সাহেবের ছোটো সংসার। কিছুক্ষণ পরই মোয়াজ্জিন সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে হন্তদন্ত হয়ে হুজুরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দুচোখ বেয়ে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে। ধরা গলায় তিনি বললেন, হুজুর, আমার মোবাইল, মানিব্যাগ আর স্বর্ণের আংটিটাও তুকাইয়া ফাইরাম না! এই আংটিটা কত যত্ন করি নতুন বউ দেখার লাগি রাখিছলাম হুজুর...
মোয়াজ্জিনের সেই করুণ কণ্ঠস্বরে শাহপরানের আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। ইমাম সাহেব বুঝতে পারলেন- রাতের সেই দুঃস্বপ্ন আর শরীরের অবশ হয়ে আসা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না। যখন তাঁরা গভীর ঘুমে কিংবা সেই অজানার ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক তখনই হয়তো নিঃশব্দ কোনো ছায়া এসে তাঁদের অতি আদরের সম্বলটুকু নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে অজানায়।
শাহপরানের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালটি একরাশ হাহাকারে মুহ্যমান। আর আংটি হারানো মোয়াজ্জিনের শূন্য দৃষ্টি কুয়াশার বুক ভেদ করে হারিয়ে গেছে দূর দিগন্তের পানে।
১৮.০২.২০২৬
সিলেট, বাংলাদেশ

কোন মন্তব্য নেই