গলাকাটা মসজিদ: বারোবাজারে সুলতানি স্থাপত্য
গলাকাটা মসজিদ: বারোবাজারে সুলতানি স্থাপত্য
ভূমিকা:
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার (প্রাচীন মুহাম্মদাবাদ শহর) অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে গলাকাটা মসজিদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি সুলতানি আমলের একটি অনন্য স্থাপত্য, যা দীর্ঘকাল মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল।
ইতিহাস: ঐতিহাসিকদের মতে, এই মসজিদটি ১৫শ শতাব্দীর শেষভাগে বা ১৬শ শতাব্দীর শুরুতে (সম্ভবত সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ-এর আমলে) নির্মিত হয়েছিল। মধ্যযুগে এই অঞ্চলটি যখন একটি সমৃদ্ধ শহর ছিল, তখন এই মসজিদটি নির্মিত হয়। দীর্ঘকাল অবহেলার কারণে এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে মাটির নিচে ঢাকা পড়ে যায়। ১৯৯০ সালের দিকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন কার্য চালিয়ে এই মসজিদের ধ্বংসাবশেষ এবং এর অপূর্ব কারুকার্য উদ্ধার করে। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা।
স্থাপত্যশৈলী (Architecture): গলাকাটা মসজিদটি বর্গাকার পরিকল্পনায় নির্মিত একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭.৬২ মিটার এবং দেওয়ালগুলো প্রায় ১.৫ মিটার পুরু। মসজিদের ভেতরে ছয়টি কালো পাথরের স্তম্ভ ছিল, যা ছাদের গম্বুজকে ধরে রাখত। পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি কারুকার্যময় মিহরাব রয়েছে, যার মধ্যে মাঝখানেরটি বড় এবং অত্যন্ত সুন্দর পোড়ামাটির লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশায় অলঙ্কৃত। মসজিদের ভেতরে পাথরের স্তম্ভে এবং প্রবেশপথের খিলানেও সূক্ষ্ম নকশা দেখা যায়। এই মসজিদের নির্মাণে ইটের পাশাপাশি কালো পাথরের ব্যবহার একে অন্যান্য মসজিদের চেয়ে আলাদা করেছে।
নামকরণ: এই মসজিদের নামকরণের সাথে একটি করুণ লোককথা জড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, অনেক আগে কোনো এক অত্যাচারী রাজা বা ডাকু সর্দার এই মসজিদের সামনের দীঘির পাড়ে অসংখ্য মানুষের মাথা কেটে বা গলা কেটে হত্যা করেছিল। সেই 'গলাকাটা'র ঘটনা থেকেই লোকমুখে মসজিদটির নাম হয়ে যায় 'গলাকাটা মসজিদ'। তবে ঐতিহাসিকভাবে এর অন্য কোনো প্রশাসনিক নাম পাওয়া যায়নি।
কোথায় অবস্থিত? (Location)
এটি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ইউনিয়নের মিঠাপুকুর গ্রামে অবস্থিত। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫০০-৭০০ মিটার।
কেন যাবেন? (Reason to Visit)
সুলতানি স্থাপত্য: বাংলার সুলতানি আমলের পোড়ামাটির নকশা ও পাথরের স্থাপত্য দেখার জন্য।
ইতিহাসের রহস্য: মসজিদের নামকরণের রহস্য এবং বারোবাজারের প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে জানতে।
ফটোগ্রাফি: প্রাচীন ইটের দেয়াল এবং নকশাকৃত মিহরাবের চমৎকার সব ছবি তোলার জন্য।
কখন যাবেন? (Best Time to Visit)
বছরের যেকোনো সময় যাওয়া যায়, তবে শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক। দিনে দিনে ভ্রমণ শেষ করতে চাইলে সকালের দিকে পৌঁছানো ভালো।
কীভাবে যাবেন / রুট প্ল্যান (Step by Step Route)
১. ঢাকা থেকে: গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে সরাসরি ঝিনাইদহ বা যশোরগামী বাসে চড়ে বারোবাজার বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে।
২. যশোর থেকে: যশোর বাসস্ট্যান্ড থেকে কালীগঞ্জগামী যেকোনো বাসে ২০-৩০ মিনিটে বারোবাজার আসা যায়।
৩. স্থানীয় যাতায়াত: বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে হেঁটে বা রিকশা/ভ্যানে করে খুব সহজেই গলাকাটা মসজিদে পৌঁছানো যায়।
কী দেখবেন? (Main Attractions)
মসজিদের কারুকার্য: দেয়াল ও মিহরাবে খচিত সুলতানি আমলের টেরাকোটা।
কালো পাথরের স্তম্ভ: মসজিদের অভ্যন্তরে থাকা প্রাচীন পাথরের স্তম্ভসমূহ।
গলাকাটা দীঘি: মসজিদের সম্মুখভাগে অবস্থিত সেই বিশাল ঐতিহাসিক দীঘি।
সংলগ্ন অন্যান্য মসজিদ: কাছেই অবস্থিত গোড়ার মসজিদ ও শুকুর মল্লিক মসজিদ।
খরচ (Expenses)
প্রবেশ ফি: এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
যাতায়াত: বারোবাজার থেকে রিকশা বা ভ্যান ভাড়া জনপ্রতি ১০-২০ টাকা।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা (Transport & Dining)
পরিবহন: ইজিবাইক, ভ্যান এবং রিকশা।
খাবার: বারোবাজার বাসস্ট্যান্ডে বেশ কিছু সাধারণ খাবারের হোটেল রয়েছে। এখানকার মিষ্টি ও দই বেশ সুস্বাদু।
যোগাযোগ ও আবাসন (Accommodation)
বারোবাজারে থাকার ভালো ব্যবস্থা নেই। রাত্রিযাপনের জন্য ঝিনাইদহ সদর বা যশোর শহরের উন্নত মানের হোটেলগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা (Cautions)
এটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা, তাই দেয়াল বা মিহরাবের কারুকার্যে স্পর্শ করবেন না।
মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করুন এবং কোনো ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না।
স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Attractions)
গোড়ার মসজিদ (সবচেয়ে সুন্দর নকশা)।
শুকুর মল্লিক মসজিদ।
গাজী-কালু ও চম্পাবতীর মাজার।
সাতগাছিয়া মসজিদ।
রিভিউ ও টিপস (Reviews & Tips)
পর্যটকদের মতে, গলাকাটা মসজিদের চারপাশের নিরিবিলি পরিবেশ এবং পুকুর পাড়টি বেশ চমৎকার। টিপস হলো, বারোবাজারের সব মসজিদ একসাথে দেখার জন্য একটি ভ্যান ২-৩ ঘণ্টার জন্য রিজার্ভ করে নিলে অল্প সময়ে সব দেখা সম্ভব।
https://munshiacademy.blogspot.com/
কোন মন্তব্য নেই