চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়: মাটির নিচে চাপা পড়া এক প্রাচীন জ্ঞানপীঠের সন্ধানে
চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়: মাটির নিচে চাপা পড়া এক প্রাচীন জ্ঞানপীঠের সন্ধানে
ভূমিকা (Introduction):
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সাগরনাল এলাকায় অবস্থিত 'চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়' ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় স্থান। ধারণা করা হয়, এটি ভারতের নালন্দা বা তক্ষশিলার সমসাময়িক একটি প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। ১৯২৯ সালে আবিষ্কৃত 'পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন' (মহারাজা শ্রীচন্দ্র কর্তৃক প্রদত্ত) থেকে এই বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, দশম শতাব্দীতে শ্রীহট্ট বা সিলেট অঞ্চলে চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্র এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি কেবল একটি উপাসনালয় ছিল না, বরং এখানে চতুর্বেদসহ নানা শাস্ত্র পড়ানো হতো।
বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো দৃশ্যমান না থাকলেও, সাগরনাল এলাকার মাটির নিচে প্রাচীন ইট, মৃৎপাত্র এবং স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন, এই পাহাড়ী ও বনাঞ্চল ঘেরা মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। যারা ইতিহাস খুঁড়তে ভালোবাসেন এবং প্রাচীন বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির শিকড় খুঁজতে চান, তাদের জন্য সাগরনালের এই চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি একটি বিশেষ আকর্ষণের নাম। প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধতার মাঝে ইতিহাসের এই হারানো গৌরব খুঁজে পাওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
কোথায় অবস্থিত? (Location)
এটি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নে অবস্থিত। জুড়ী উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার।
কেন যাবেন? (Reason to Visit)
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ১০ম শতাব্দীর প্রাচীন বাংলার একটি কাল্পনিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পরিদর্শনের জন্য।
প্রত্নতাত্ত্বিক কৌতূহল: পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে বর্ণিত সেই বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান স্বচক্ষে দেখতে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ: সাগরনাল এলাকার চা বাগান, পাহাড় এবং টিলা ঘেরা চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে।
ইতিহাসের সন্ধানে: প্রাচীন শ্রীহট্ট ও চন্দ্র রাজবংশের শাসনকাল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে।
কখন যাবেন? (Best Time to Visit)
সারা বছরই যাওয়া যায়। তবে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক, কারণ এ সময় পাহাড়ী মেঠো পথে হাঁটা সহজ হয়। বর্ষাকালে এলাকাটি বেশ পিচ্ছিল থাকে কিন্তু প্রকৃতির রূপ হয় অপূর্ব।
কীভাবে যাবেন / রুট প্ল্যান (Step by Step Route)
১. মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গল থেকে: প্রথমে বাস বা সিএনজিতে করে জুড়ী উপজেলা সদরে আসতে হবে।
২. জুড়ী থেকে সাগরনাল: জুড়ী বাজার থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি সাগরনাল ইউনিয়নের বাউরী এলাকা বা সাগরনাল চা বাগান এলাকায় যেতে হবে।
৩. জুড়ী রেলস্টেশন থেকে: ট্রেনে এলে জুড়ী স্টেশনে নেমে সেখান থেকেও সরাসরি সিএনজি যোগে সাগরনাল যাওয়া যায়।
কী দেখবেন? (What to See)
ধ্বংসাবশেষের স্থান: সাগরনাল এলাকার সেই স্থানগুলো যেখানে মাটির নিচে প্রাচীন ইটের গাঁথুনি পাওয়া গেছে।
সাগরনাল চা বাগান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য এলাকার চারপাশের দৃষ্টিনন্দন চা বাগান।
পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের প্রতিলিপি (যদি স্থানীয় সংগ্রহে থাকে): যদিও মূল শাসনটি যাদুঘরে সংরক্ষিত, তবে এলাকার ইতিহাস সংশ্লিষ্ট তথ্যফলক দেখার সুযোগ হতে পারে।
পাহাড়ী ঝিরি ও টিলা: এই ঐতিহাসিক স্থানের চারপাশের মায়াবী পাহাড়ি পরিবেশ।
খরচ (Expenses)
এটি একটি উন্মুক্ত এলাকা, তাই এখানে প্রবেশের জন্য কোনো ফি বা টিকেট লাগে না। যাতায়াত খরচ আপনার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে (জুড়ী থেকে আসা-যাওয়া ১০০-২০০ টাকার মধ্যে সম্ভব)।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা (Transport & Dining)
পরিবহন: সিএনজি অটোরিকশা এবং ইজিবাইক।
খাবার: সাগরনাল বাজারে সাধারণ মানের খাবারের হোটেল রয়েছে। ভালো মানের খাবারের জন্য জুড়ী বাজার বা কুলাউড়া শহরে ফিরে আসা ভালো।
যোগাযোগ ও আবাসন (Accommodation)
সাগরনাল এলাকায় থাকার ব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের কুলাউড়া বা মৌলভীবাজার শহরের হোটেলগুলোতে ফিরে যেতে হবে। জুড়ীতেও সাধারণ মানের কিছু গেস্ট হাউস পাওয়া যেতে পারে।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা (Cautions)
এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই মাটির নিচে কিছু পেলে তা নষ্ট করবেন না বা সাথে নিয়ে আসবেন না।
চা বাগান এবং পাহাড়ী এলাকায় চলাফেরার সময় স্থানীয়দের অনুমতি নিন এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
নির্জন এলাকায় একা না যাওয়াই ভালো, সাথে স্থানীয় গাইড বা কাউকে রাখুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Attractions)
লাঠিটিলা বন।
জুড়ী নদীর দৃশ্য।
কুলাউড়ার বড়লেখা এলাকার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত (কিছুটা দূরে)।
হাকালুকি হাওর।
টিপস (Tips)
যাওয়ার আগে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজা শ্রীচন্দ্রের ইতিহাস সম্পর্কে একটু পড়ে নিলে ভ্রমণটি অনেক বেশি অর্থবহ হবে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে কথা বললে তাঁরা অনেক সময় প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ নিয়ে রোমাঞ্চকর লোককথা শুনিয়ে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই