Header Ads

মুনশি একাডেমি

শিক্ষা ও সাহিত্যভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
নোট ও সাজেশন বিসিএস ও এনটিআরসিএ বি.এড ও ব্যাংক প্রস্তুতি

ঘুমন্ত পুরী | ঠাকুরমার ঝুলি | Ghumonto Puri | Thakurmar Jhuli Bangla Rup...


ঘুমন্ত পুরী-ঠাকুরমার ঝুলি | Ghumonto Puri | Thakurmar Jhuli 


 

ঘুমন্ত পুরী

(ঠাকুরমার ঝুলি থেকে রূপকথার গল্প)

অনেক দূরে, পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা এক দেশে ছিল এক সমৃদ্ধ রাজ্য। রাজ্যের নাম ছিল ঘুমন্ত পুরী। এই রাজ্য একসময় ছিল আনন্দ, গান আর উৎসবে ভরপুর। রাজা ছিলেন প্রজাহিতৈষী, রানি ছিলেন দয়ালু ও জ্ঞানী। কিন্তু তাদের জীবনে ছিল এক গভীর দুঃখ—দীর্ঘদিন বিবাহিত জীবন কাটালেও তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না।

রাজা-রানি দেবতার কাছে মানত করলেন। বহু তীর্থে গেলেন, দান করলেন, প্রার্থনা করলেন। অবশেষে তাঁদের প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে এক ঋষি আশীর্বাদ করলেন—“তোমাদের কন্যাসন্তান হবে, সে হবে অপরূপা। তবে সাবধান, তার জীবনে এক ভয়ংকর অভিশাপ অপেক্ষা করছে।”

সময় গড়িয়ে গেল। রানি এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেন। রাজপ্রাসাদ আনন্দে ভরে উঠল। রাজকন্যার নাম রাখা হলো পদ্মাবতী। তার রূপে যেমন সৌন্দর্য, তেমনি হৃদয়ে দয়া আর বুদ্ধিতে প্রখরতা।

রাজা মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। ঋষির কথামতো তিনি রাজ্যের সব সূঁচ, কাঁটা ও ধারালো বস্তু নিষিদ্ধ করে দিলেন। রাজাদেশ জারি হলো—রাজ্যের কোথাও চরকা বা সূঁচ থাকবে না।

পদ্মাবতী ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। ষোল বছরে পা দিতেই সে হয়ে উঠল রাজ্যের সবার নয়নের মণি। কিন্তু নিয়তির লেখা কে মুছতে পারে?

রাজকন্যার জন্মদিনের একদিন আগে, রাজপ্রাসাদে এক অচেনা বৃদ্ধা এল। তার হাতে ছিল একটি পুরোনো চরকা। রাজকন্যা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?” বৃদ্ধা বলল, “এতে সুতো কাটা হয়, মা।” কৌতূহলবশে পদ্মাবতী চরকা ছুঁতেই তার আঙুলে সূঁচ ফুঁটে গেল।

মুহূর্তের মধ্যে রাজকন্যা অচেতন হয়ে পড়ল।

খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা রাজ্যে। রাজা-রানি ছুটে এলেন। রাজকন্যা নিথর, নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে চলছে—কিন্তু জ্ঞান নেই। ডাকা হলো রাজ্যের সব বৈদ্য, তান্ত্রিক, জ্যোতিষী। অবশেষে এক জ্ঞানী সাধু বললেন—

“এটি মৃত্যু নয়, গভীর ঘুম। রাজকন্যা একশো বছর ঘুমাবে। যখন সত্যিকারের সাহসী ও নির্মল হৃদয়ের যুবক আসবে, তখনই এই ঘুম ভাঙবে।”

এই অভিশাপের সঙ্গে সঙ্গে ঘটল আরও এক আশ্চর্য ঘটনা। পুরো রাজ্য ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল। রাজা, রানি, সৈন্য, প্রজা—সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো। প্রাসাদের চারপাশে কাঁটাঝোপ আর লতা-পাতা বেড়ে উঠল। ঘুমন্ত রাজ্য পরিণত হলো রহস্যময় পুরীতে।

বছরের পর বছর কেটে গেল। দূরদেশের মানুষ শুনতে লাগল ঘুমন্ত পুরীর গল্প। বহু রাজপুত্র চেষ্টা করল সেখানে প্রবেশ করতে, কিন্তু কেউ আর ফিরে এল না। কাঁটাঝোপ, ভয়ংকর অরণ্য আর অদৃশ্য শক্তি সবাইকে ফিরিয়ে দিত।

একদিন দূর দেশের এক তরুণ রাজপুত্র এই গল্প শুনল। তার নাম ছিল বিক্রম। সে সাহসী, কিন্তু অহংকারী নয়; শক্তিশালী, কিন্তু হৃদয় ছিল দয়ায় ভরা। বিক্রম সিদ্ধান্ত নিল—সে ঘুমন্ত পুরীতে যাবে।

পথে এক বৃদ্ধের সঙ্গে তার দেখা হলো। বৃদ্ধ বললেন, “অনেকেই গেছে, কেউ ফেরেনি।” বিক্রম শান্ত কণ্ঠে বলল, “যদি ভাগ্যে লেখা থাকে, আমি ফিরব। না হলে সত্যের পথে মরাই শ্রেয়।”

বৃদ্ধ তাকে আশীর্বাদ করে দিলেন।

অদ্ভুতভাবে, যেদিন বিক্রম ঘুমন্ত পুরীর কাছে পৌঁছাল, কাঁটাঝোপ নিজে থেকেই সরে গেল। অরণ্য পথ করে দিল। যেন রাজ্য নিজেই তাকে আহ্বান জানাচ্ছে।

প্রাসাদে ঢুকে বিক্রম দেখল—সবাই ঘুমাচ্ছে। সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নিথর। রান্নাঘরে খাবার পড়ে আছে, কিন্তু কেউ নড়ে না। সময় যেন থমকে আছে।

অবশেষে সে পৌঁছাল রাজকন্যার কক্ষে। সোনালি খাটে শুয়ে আছে পদ্মাবতী—শান্ত, সুন্দর, দীপ্তিময়। বিক্রমের হৃদয় কেঁপে উঠল। সে অনুভব করল—এ শুধু রূপ নয়, এ কোনো মহৎ আত্মা।

বিক্রম ধীরে ধীরে রাজকন্যার কপালে চুম্বন করল।

মুহূর্তের মধ্যেই অলৌকিক ঘটনা ঘটল। রাজকন্যার চোখ খুলল। সঙ্গে সঙ্গে প্রাসাদে জীবন ফিরে এলো। রাজা-রানি জেগে উঠলেন, প্রজারা হাঁটতে লাগল, পাখিরা ডাকল। ঘুমন্ত পুরী আবার জেগে উঠল।

রাজা সব শুনে বিক্রমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাজকন্যা পদ্মাবতীর সঙ্গে বিক্রমের বিবাহ সম্পন্ন হলো। আনন্দে ভরে উঠল রাজ্য।

ঘুমন্ত পুরী আবার হয়ে উঠল জীবন্ত, হাসিমুখর এক রাজ্য। আর এই গল্প রয়ে গেল মানুষের মুখে মুখে—সাহস, ধৈর্য আর বিশুদ্ধ হৃদয়ের জয়ের গল্প হিসেবে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.