অনুমতি (শিশুতোষ গল্প) - মুনশি আলিম
অনুমতি (শিশুতোষ গল্প)
মুনশি আলিম
বিকেল বেলা| রাজু তার মা-বাবার সাথে রিকশায় চড়ে জিন্দাবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো| বেশ ফুরফুরে বাতাস| বাবার কোলে বসে ছোট্ট রাজু একটু পর পর প্রশ্ন করছে—আব্বু, এটা কী? ওটা? ওইটা কী? ওই যে ওইটা? ... এভাবে প্রশ্নমালা চলতেই থাকে| রাজু ক্লান্ত হয় না| প্রকৃতিকে জানার কৌতূহল তার খুবই বেশি| রাজুর বয়স খুব বেশি নয়| আসছে ভাদ্র মাসে সে ছয় বছরে পা দিবে|
রাজুর বাবা লিটন| পেশায় কলেজশিক্ষক| খুবই জ্ঞানী মানুষ| ছেলের শত প্রশ্নেও তিনি বিরক্ত হন না| বরং অতি উৎসাহ নিয়ে একেএকে তার সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দেন| রিকশা অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে এসে থামল| রিকশা ভাড়া মিটিয়ে লিটন সাহেব বললেন—তোমরা একটু অপেক্ষা কর, আমি বুথ থেকে টাকা তুলে আসছি|
দু’মিনিটের মধ্যেই তিনি ফিরে এলেন| হাসি মুখে বললেন—সামনেই জিন্দাবাজার| চলো, একটু জায়গা আমরা হেঁটেই যাই| বলেই তিনি হাঁটা শুরু করে দিলেন| রাজু মায়ের বাম হাত শক্ত করে ধরল| রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম| ফুটপাতগুলোতে মানুষের উপস্থিতিও ছিল বেশি| লন্ডন ম্যানশনের সামনে যেতেই রাজুর চোখ পড়ল ফুটপাতের ঝুড়ি ভর্তি আঙুরের ওপর| দেখতে বেশ চকচকে আর রসাল| রাজু লোভ সামলাতে পারল না| ডানহাত দিয়ে একথোকা নিয়ে নিল| সামনে পা বাড়াতেই পেছন থেকে ফলবিক্রেতা বললেন—খোকা, অপরের জিনিস না বলে নিতে নেই|
রাজুর কর্মকাণ্ড দেখে লিটন সাহেব খুবই লজ্জা পেলেন| ফলবিক্রেতার কাছে বারবার দুঃখপ্রকাশ করলেন| কিন্তু রাজুকে একটুও গালিগালাজ করলেন না| কেবল মুচকি হেসে বললেন—বাবা রাজু, অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিস ধরতে নেই| মনে থাকবে? রাজু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে|
তারা পুনরায় হাঁটতে থাকে| জিন্দাবাজার পয়েন্টে তখন খুবই ভিড়| এই ভিড়ের মধ্যে লম্বাগোছের একলোক লিটন সাহেবের পিছু নেয়| সে পিছনের পকেটে কৌশলে হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগ বের করে| রাজুর মা অন্যমনস্ক থাকায় বিষয়টি তার নজরে আসেনি| লিটন সাহেবও ব্যাপারটি টের পাননি| লোকটি যখন সরে পড়বে ঠিক তখনই রাজু লোকটির হাত ধরল| ভরাট গলায় বললো—আঙ্কেল!
পরিচিত কণ্ঠে আঙ্কেল ডাক শুনে লোকটি আর পালানোর চেষ্টা করেনি| বরং মমতার দৃষ্টি নিয়ে ফিরে তাকালেন| রাজু জ্ঞানীদের মতো ভাব নিয়ে বললো—অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিস ধরতে নেই| রাজু কার সাথে কথা বলছে তা জানার জন্য লিটন সাহেব পিছনের দিকে তাকালেন| কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেন—কী হয়েছে রাজু?
— ওই আঙ্কেল, অনুমতি ছাড়াই তোমার মানিব্যাগ নিয়ে নিয়েছে| এটা অন্যায় করেছে না আব্বু?
— হ্যাঁ, আব্বু| ভীষণ অন্যায় করেছে|
পকেটমার খুব বিস্মিত হয়| কম্পিত হাতে মানিব্যাগটি লিটন সাহেবকে ফিরিয়ে দেয়| কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি নিয়ে রাজুর দিকে তাকায়| লোকটির দুচোখ দিয়ে তখন টপটপ করে পানি ঝরছিল| কী আশ্চর্য! মারপিট ছাড়া কোনো পুরুষ লোক কি এভাবে কাঁদতে পারে? কাঁদবে না আবার, রাজুর মতোই যে তার একটি ছেলে ছিল; যে ছেলেটি টাকার অভাবে প্রায় বিনা চিকিৎসায় গত বছর মারা গেছে| এরপর থেকেই সে টাকা উপার্জনের জন্য এ পথ বেছে নিয়েছে| আহা! সে ছেলেটি দেখতে একেবারেই যেনো হুবহু রাজুর মতো! কণ্ঠটাও|
বাম হাত দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে লোকটি বললেন—বাবা, আমার অন্যায় হয়েছে| মস্তবড়ো অন্যায়! এই কান ধরছি, আর কোনোদিনও এসব কাজ করব না|
তুমি বয়সে ছোটো হয়েও আজ আমাকে যা শিখালে তা কোনোদিনও ভুলবো না| দোয়া করি বাবা, অনেক বড়ো হও| লিটন সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন—ইচ্ছে করলে আপনি আমাকে পুলিশে দিতে পারেন| লিটন সাহেব বললেন—তা আর লাগবে না| আপনি যেহেতু আপনার নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন তাতেই চলবে| লোকটি পুনরায় চোখের পানি মুছতে মুছতে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য গেল|
এরপর ওই লোক আর কোনোদিন অন্য কারও পকেট মারেনি|
নীতিকথা : অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিস ধরতে নেই

কোন মন্তব্য নেই