ট্রেন ভ্রমণ ও এক নিমেষের তিক্ত বাস্তবতা
ট্রেন ভ্রমণ ও এক নিমেষের তিক্ত বাস্তবতা
মুনশি আলিম
চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম। জানালার পাশের সিটটা পেয়ে মনে মনে একটু খুশিই হয়েছিলাম। নন-এসি বগি, গরমের সঙ্গে মিশে ছিল লোহার চাকার ছন্দ আর অচেনা মানুষের গুঞ্জন। রাত তখন ১১টা কি ১২টা; ঠিক মনে নেই। বাইরে ঘন অন্ধকার। মাঝে মাঝে দূরের কোনো আলোর বিন্দু হঠাৎ এসে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
বই পড়া শেষ করে মোবাইলটা হাতে নিলাম। বগিতে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন যাত্রীকে লক্ষ্য করলাম- তারা যেন বারবার আমার দিকেই তাকাচ্ছিল। কিন্তু এসব ভাবার মতো তেমন কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না। নিজের মতো করে ফেসবুক স্ক্রোল করতে শুরু করলাম। একটা গল্পে ডুবে গেলাম। শব্দগুলো যেন আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্য এক জগতে।
চারপাশের শব্দ, মানুষের কোলাহল সবকিছু ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। আমি তখন সম্পূর্ণ তন্ময়, গল্পের ভেতরে হারিয়ে গেছি।
ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন ঝড়ের বেগে, জানালার বাইরে থেকে একটা হাত হঠাৎ ভেতরে ঢুকে এল। কোনো পূর্বাভাস নেই, কোনো সুযোগ নেই। হ্যাচকা টানে আমার হাত থেকে মোবাইলটা ছিনিয়ে নিল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে বুঝে ওঠার আগেই সেটি অন্ধকারের ভেতরে মিলিয়ে গেল।
আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলাম। হাতটা এখনও শূন্যে; যেন মোবাইলটা আঁকড়ে ধরে আছি। বুকের ভেতর ধকধক করছে। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। চারপাশে মানুষজনের কোলাহল চলছে। ট্রেন ছুটে চলেছে নিজের গতিতে; অথচ আমার সময়টা যেন হঠাৎ থমকে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে বুঝলাম- শুধু একটা যন্ত্র নয়; হাতছাড়া হয়ে গেল আমার অনেক স্মৃতি, অনেক প্রয়োজন, অনেক অভ্যাস। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। মনে হচ্ছিল, সেই অচেনা হাতটা যেন শুধু মোবাইলটাই নেয়নি; চুরি করে নিয়েছে এক টুকরো অসতর্কতাও।
আমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। নিজের অসহায়ত্ব আর বিস্ময়ের মাঝখানে নীরবে বসে আছি। আর ট্রেনটা নির্লিপ্তভাবে ছুটে চলেছে তার গন্তব্যের দিকে।
০১৭/০২/২০২৪
সিলেট
— অস্তিত্বের জ্যামিতি (সম্ভাব্য গল্পগ্রন্থ), লেখক: মুনশি আলিম

কোন মন্তব্য নেই