Header Ads

মুনশি একাডেমি

শিক্ষা ও সাহিত্যভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
নোট ও সাজেশন বিসিএস ও এনটিআরসিএ বি.এড ও ব্যাংক প্রস্তুতি

মাসি-পিসি - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: গল্পের মূলভাব, লেখক পরিচিতি ও সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর

মাসি পিসি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মাসি পিসি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নাটক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মাসিপিসি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মাসি-পিসি, নারী জাগরণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ১ম পত্র, মাসি পিসি গল্প hsc ব্যাখ্যা, মাসি পিসি গল্প, মাসি পিসি গল্প hsc, মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়, মাসি পিসি গল্পের ব্যাখ্যা, মাসি পিসি গল্প এইচএসসি, মাসি পিসি গল্প noman sir, মানিক বন্দ্যােপাধ্যায়  masi pisi manik bondopaddhay, manik bandopaddhay, manik bondopaddhay, masi pishi hsc bangla mcq, mashipishi manik, bangla 1st paper masi pisi one shot mcq class, mashi pishi bangla hsc mcq, masi pishi bangla 1st paper, mashi-pishi, masi pisi mcq hsc bangla, hsc bangla 1st paper masi pisi mcq, mashi pishi mcq, masi pisi golpo mcq, class 11 bangla 1st paper mcq suggestion, masi pishi, mashi pishi golpo hsc tanvir sir, hsc bangla 1st paper mashi pishi, masi pisi all board mcq, mashi pishi bangla hsc, masi pisi mcq

মাসি-পিসি - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: গল্পের মূলভাব, লেখক পরিচিতি ও সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর


 লেখক পরিচিতি

মাসি পিসি গল্প মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখক-পরিচিতি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিহারের সাঁওতাল পরগনার দুমকায় ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯এ মে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতার নাম নীরদাসুন্দরী দেবী । তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ডাকনাম মানিক। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে তিনি পড়াশোনা করেন ।

মাত্র আটচল্লিশ বছর তিনি বেঁচেছিলেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি পড়ার সময়ে মাত্র বিশ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে তিনি প্রথম গল্প “অতসীমামী” লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তারপর জীবনের বাকি আটাশ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে গেছেন। মাঝে বছর তিনেক মাত্র তিনি চাকরি ও ব্যবসায়িক কাজে নিজেকে জড়ালেও বাকি পুরো সময়টাই তিনি সার্বক্ষণিকভাবে সাহিত্যসেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

 

মাসি পিসি গল্প -মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

উপন্যাস ও ছোটগল্প লেখক হিসেবে মানিক বাংলা সাহিত্যে খ্যাতিমান। অল্প সময়েই প্রচুর গল্প-উপন্যাস সৃষ্টি করেন। সেই সঙ্গে লিখেছেন কিছু কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ ও ডায়েরি। বিজ্ঞানমনস্ক এই লেখক মানুষের মনোজগৎ তথা অন্তর্জীবনের রূপকার হিসেবে সার্থকতা দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে সমাজবাস্তবতার শিল্পী হিসেবেও স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘জননী’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা”, ‘চিহ্ন’ প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ‘প্রাগৈতিহাসিক’, ‘সরীসৃপ’, ‘সমুদ্রের স্বাদ’, ‘কুষ্ঠরোগীর বৌ’, ‘টিকটিকি’, ‘হলুদ পোড়া”, ‘আজ কাল পরশুর গল্প’, ‘হারানের নাতজামাই’, ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ প্রভৃতি । কলকাতায় ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের তেসরা ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

মাসি পিসি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষবেলায় খালে এখন পুরো ভাটা। জল নেমে গিয়ে কাদা আর ভাঙা ইটপাটকেল ও ওজনে ভারি আবর্জনা বেরিয়ে পড়েছে। কংক্রিটের পুলের কাছে খালের ধারে লাগানো সালতি থেকে খড় তোলা হচ্ছে পাড়ে। পাশাপাশি জোড়া লাগানো দুটো বড় সালতি বোঝাই আঁটিবাঁধা খড় তিনজনের মাথায় চড়ে গিয়ে জমা হচ্ছে ওপরের মস্ত গাদায়। ওঠানামার পথে ওরা খড় ফেলে নিয়েছে কাদায় । সালতি থেকে ওদের মাথায় খড় তুলে দিচ্ছে দুজন। একজনের বয়স হয়েছে, আধপাকা চুল, রোগা শরীর। অন্যজন মাঝবয়সী, বেঁটে, জোয়ান, মাথায় ঠাসা কদমছাঁটা রুক্ষ চুল ।

পুলের তলা দিয়ে ভাটার টান ঠেলে এগিয়ে এল সরু লম্বা আরেকটা সালতি, দু-হাত চওড়া হয়নি না হয় । দু-মাথায় দাঁড়িয়ে দুজন প্রৌঢ়া বিধবা লগি ঠেলছে, ময়লা মোটা থানের আঁচল দুজনেরই কোমরে বাঁধা। মাঝখানে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে অল্পবয়সী একটি বৌ। গায়ে জামা আছে, নকশা পাড়ের সস্তা সাদা শাড়ি। আঁটসাঁট থমথমে গড়ন, গোলগাল মুখ ।

“মাসি-পিসি ফিরছে কৈলেশ”, বুড়ো লোকটি বলল । কৈলাশ বাহকের মাথায় খড় চাপাতে ব্যস্ত ছিল। চটপট শেষ আঁটিটা চাপিয়ে দিয়ে সে যখন ফিরল, মাসি-পিসির সালতি দু-হাতের মধ্যে এসে গেছে।

“ ও মাসি, ওগো পিসি, রাখো রাখো। খপর আছে শুনে যাও।”

সামনের দিকে লগি পুঁতে মাসি-পিসি সালতির গতি ঠেকায়, আহ্লাদি সিঁথির সিঁদুর পর্যন্ত ঘোমটা টেনে দেয়। সামনে থেকে মাসি বলে বিরক্তির সঙ্গে, “বেলা আর নেই কৈলেশ।” পেছনে থেকে পিসি বলে, “অনেকটা পথ যেতে হবে কৈলেশ ।”

মাসি-পিসির গলা ঝরঝরে, আওয়াজ একটু মোটা, একটু ঝংকার আছে । কৈলাশের খবরটা গোপন, দুজনে লম্বা লম্বা সালতির দু-মাথায় থাকলে সম্ভব নয় চুপে চুপে বলা । মাসি বড় সালতির খড় ঠেকানো বাঁশটা চেপে ধরে থাকে, পিসি লগি হাতে নিয়েই পিছন থেকে এগিয়ে আসে সামনের দিকে। আহ্লাদি যেখানে ছিল সেখানে বসেই কান পেতে রাখে। কথাবার্তা সে সব শুনতে পায় সহজেই। কারণ, সে যাতে শুনতে পায় এমনি করেই বলে কৈলাশ ।

“বলি মাসি, তোমাকেও বলি পিসি”, কৈলাশ শুরু করে, “মেয়াকে একদম শ্বশুরঘর পাঠাবে না মনে করেছ যদি, সে কেমন ধারা কথা হয়? এত বড় সোমত্ত মেয়া, তোমরা দুটি মেয়েলোক বাদে ঘরে একটা পুরুষমানুষ নেই, বিপদ-আপদ ঘটে যদি তো—”

মাসি বলে, “খুনসুটি রাখো দিকি কৈলেশ তোমার, মোদ্দাকথাটা কী তাই কও, বললে না যে খপর আছে, কী?” পিসি বলে, “খপরটা কী তাই কও। বেলা বেশি নেই কৈলেশ।”
মাসি-পিসির সাথে পারা যাবে না জানে কৈলাশ। অগত্যা ফেনিয়ে রসিয়ে বলবার বদলে সে সোজা কথায় আসে,
“জগুর সাথে দেখা হলো কাল । খড় তুলে দিতে সাঁঝ হয়ে গেল, তা দোকানে এটটু-মানে আর কি চা খেতে গেছি চায়ের দোকানে, জগুর সাথে দেখা ।”

মাসি বলে, “চায়ের দোকান না কিসের দোকান তা বুঝিছি কৈলেশ, তা কথাটা কী?”
পিসি বলে,
“সেথা ছাড়া আর ওকে কোথা দেখবে। হাতে দুটো পয়সা এলে তোমারও স্বভাব বিগড়ে যায় কৈলেশ। তা, কী বললে জগু ?”

কৈলাশ ফাঁপরে পড়ে আড়চোখে চায় আহ্লাদির দিকে, হঠাৎ বেমক্কা জোরের সঙ্গে প্রতিবাদ করে যে, তা নয়, পুলের কাছেই চায়ের দোকান, মাসি-পিসি গিয়ে জিজ্ঞাসা করুক না সেখানে। তারপরেই জোর হারিয়ে বলে, “ওসব একরকম ছেড়ে দিয়েছে জগু । লোকটা কেমন বদলে গেছে মাসি, সত্যি কথা পিসি, জগু আর সেই জগু 66 নেই। বৌকে নিতে চায় এখন। তোমরা নাকি পণ করেছ মেয়া পাঠাবে না, তাতেই চটে আছে ৷ সম্মান তো আছে একটা মানুষের, কবার নিতে এল তা মেয়া দিলে না, তাই তো নিতে আসে না আর। আমি বলি কী, নিজেরা যেচে এবার পাঠিয়ে দেও মেয়াকে।”

মাসি বলে, “পেট শুকিয়ে লাথি ঝাঁটা খেতে? কলকেপোড়া ছ্যাকা খেতে? খুঁটির সাথে দড়িবাঁধা হয়ে থাকতে দিনভর রাতভর?”
পিসি-বলে,
“মেয়া না পাঠাই, জামাই এলে রাখিনি জামাই-আদরে তাকে? ছাগলটা বেচে দিয়ে খাওয়াইনি ভালোমন্দ দশটা জিনিস ?”
মাসি বলে,
“ফের আসুক, আদরে রাখব যদ্দিন থাকে। বজ্জাত হোক, খুনে হোক, জামাই তো। ঘরে এলে
খাতির না করব কেন? তবে মেয়া মোরা পাঠাব না ।
”
পিসি বলে,
“নে কৈলেশ, মরতে মোরা মেয়াকে পাঠাব না ।”

বুড়ো রহমান একা খড় চাপিয়ে যায় বাহকদের মাথায়, চুপচাপ শুনে যায় এদের কথা। ছলছল চোখে একবার তাকায় আহ্লাদির দিকে। তার মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে মরেছে অল্পদিন আগে। কিছুতে যেতে চায়নি মেয়েটা, দাপাদাপি করে কেঁদেছে যাওয়া ঠেকাতে, ছোট অবুঝ মেয়ে। তার ভালোর জন্যেই তাকে জোর-জবরদস্তি করে পাঠিয়ে দিয়েছিল । আহ্লাদির সঙ্গে তার চেহারায় কোনো মিল নাই। বয়সে সে ছিল অনেক ছোট, চেহারা ছিল অনেক বেশি রোগা। তবু আহ্লাদির ফ্যাকাশে মুখে তারই মুখের ছাপ রহমান দেখতে পায়, খড়ের আঁটি তুলে দেবার ফাঁকে ফাঁকে যখনই সে তাকায় আহ্লাদির দিকে।

কৈলাশ বলে, “তবে আসল কথাটা বলি । জগু মোকে বললে, এবার সে মামলা করবে বৌ নেবার জন্য। তার বিয়ে করা বৌকে তোমরা আটকে রেখেছ বদ মতলবে। মামলা করলে বিপদে পড়বে। সোয়ামি নিতে চাইলে বৌকে আটকে রাখার আইন নেই। জেল হয়ে যাবে তোমাদের। আর যেমন বুঝলাম, মামলা জগু করবেই আজকালের মধ্যে। মরবে তোমরা জান মাসি, জান পিসি, মারা পড়বে তোমরা একেবারে।”

আহ্লাদি একটা শব্দ করে, অস্ফুট আর্তনাদের মতো। মাসি ও পিসি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে কয়েক বার। মনে হয়, মনে তাদের একই কথা উদয় হয়েছে, চোখে চোখে চেয়ে সেটা শুধু জানাজানি করে নিল তারা । মাসি বলল, “ জেলে নয় গেলাম কৈলেশ, কিন্তু মেয়া যদি সোয়ামির কাছে না যেতে চায় খুন হবার ভয়ে?” বলে মাসি বড় সালতির খড় ঠেকানো বাঁশ ছেড়ে দিয়ে লগি গুঁজে দেয় কাদায়, পিসি তরতর করে পিছনে গিয়ে লগি কাদায় গুঁজে হেলে পড়ে, শরীরের ভারে সরু লম্বা সালতিটাকে এগিয়ে দেয় ভাটার টানের বিপক্ষে। বেলা একরকম নেই। ছায়া নামছে চারদিকে ।

শকুনরা উড়ে এসে বসছে পাতাশূন্য শুকনো গাছটায়। একটা শকুন উড়ে গেল এ আশ্রয় ছেড়ে অল্প দূরে আরেকটা গাছের দিকে । ডাল ছেড়ে উড়তে আর নতুন ডালে গিয়ে বসতে কী তার পাখা ঝাপটানি!

মায়ের বোন মাসি আর বাপের বোন পিসি ছাড়া বাপের ঘরের কেউ নেই আহ্লাদির । দুর্ভিক্ষ কোনোমতে ঠেকিয়েছিল তার বাপ । মহামারীর একটা রোগে, কলেরায়, সে, তার বৌ আর ছেলেটা শেষ হয়ে গেল । মাসি-পিসি তার আশ্রয়ে মাথা গুঁজে আছে অনেক দিন, দূর ছাই সয়ে আর কুড়িয়ে পেতে খেয়ে নিরাশ্রয় বিধবারা যেমন থাকে। নিজেদের ভরণপোষণের কিছু তারা রোজগার করত ধান ভেনে, কাঁথা সেলাই করে, ডালের বড়ি বেচে, হোগলা গেঁথে, শাকপাতা ফলমূল ডাঁটা কুড়িয়ে, এটা ওটা জোগাড় করে । শাকপাতা খুদকুঁড়ো ভোজন, বছরে দুজোড়া থান পরন- খরচ তো এই।

মাসি পিসি গল্প মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

বছরের পর বছর ধরে কিছু পুঁজি পর্যন্ত হয়েছিল দুজনের, রূপোর টাকা আধুলি সিকি। দুর্ভিক্ষের সময়টা বাঁচবার জন্য তাদের লড়তে হয়েছে সাংঘাতিকভাবে, আহ্লাদির বাপ তাদের থাকাটা শুধু বরাদ্দ রেখে খাওয়া ছাঁটাই করে দিয়েছিল একেবারে পুরোপুরি । তারও তখন বিষম অবস্থা। নিজেরা বাঁচে কি বাঁচে না, তার ওপর জগুর লাথির চোটে মরমর মেয়ে এসে হাজির। সে কোনদিক সামলাবে? মাসি-পিসির সেবা-যত্নেই আহ্লাদি অবশ্য সেবা বেঁচে গিয়েছিল, তার বাপ-মাও সেটা স্বীকার করেছে। কিন্তু কী করবে, গলা কেটে রক্ত দিয়ে সে ধার শোধ করা যদি-বা সম্ভব, অন্ন দেওয়ার ক্ষমতা কোথায় পাবে। পাল্লা দিয়ে মাসি-পিসি আহ্লাদির জীবনের জন্য লড়েছিল, পেল যদি তো খেয়ে, না-পেল যদি তো না-খেয়েই। অবস্থা যখন তাদের অতি কাহিল, চারদিকে না-খেয়ে মরা শুরু করেছে মানুষ, মরণ ঠেকাতেই ফুরিয়ে আসছে তাদের জীবনীশক্তি; একদিন মাসি বলে পিসিকে, “একটা কাজ করবি বেয়াইন? তাতেও তোরও দুটো পয়সা আসে, মোরও দুটো পয়সা আসে।”

শহরের বাজারে তরিতরকারি ফলমূলের দাম চড়া। গাঁ থেকে কিনে যদি বাজারে গিয়ে বেচে আসে তারা, কিছু রোজগার হবে। একা মাসির ভরসা হয় না সালতি বেয়ে অতদূর যেতে, যাওয়া-আসাও একার দ্বারা হবে না তার। পিসি রাজি হয়েছিল। এতে কিছু হবে কি না হবে ভগবান জানে, কিন্তু যদি হয় তবে রোজগারের একটা নতুন উপায় মাসি পেয়ে যাবে আর সে পাবে না, তাকে না পেলে অন্য কারো সাথে হয়ত মাসি বন্দোবস্ত করবে, তা কি পারে পিসি ঘটতে দিতে।

সেই থেকে শুরু হয় গেরস্তের বাড়তি শাকসবজি ফলমূল নিয়ে মাসি-পিসির সালতি বেয়ে শহরের বাজারে গিয়ে বেচে আসা । গাঁয়ের বাবু বাসিন্দারাও নগদ পয়সার জন্য বাগানের জিনিস বেচতে দেয় । মাসি-পিসির ভাব ছিল আগেও । অবস্থা এক, বয়স সমান, একঘরে বাস, পরস্পরের কাছে ছাড়া সুখ-দুঃখের কথা তারা

কাকেই-বা বলবে, কেই-বা শুনবে। তবে হিংসা দ্বেষ রেষারেষিও ছিল যথেষ্ট, কোন্দলও বেধে যেত কারণে অকারণে । পিসি এ বাড়ির মেয়ে, এ তার বাপের বাড়ি । মাসি উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এখানে। তাই মাসির উপর পিসির একটা অবজ্ঞা অবহেলার ভাব ছিল। এই নিয়ে পিসির অহংকার আর খোঁচাই সবচেয়ে অসহ্য লাগত মাসির। ধীর শান্ত দুঃখী মানুষ মনে হতো এমনি তাদের, কিন্তু ঝগড়া বাধলে অবাক হয়ে যেতে হতো তাদের দেখে। সে কী রাগ, সে কী তেজ, সে কী গোঁ! মনে হতো এই বুঝি কামড়ে দেয় একে অপরকে, এই বুঝি কাটে বঁটি দিয়ে ।

শাকসবজি বেচে বাঁচবার চেষ্টায় একসঙ্গে কোমর বেঁধে নেমে পড়ামাত্র সব বিরোধ সব পার্থক্য উড়ে গিয়ে দুজনের হয়ে গেল একমন, একপ্রাণ। সে মিল জমজমাট হয়ে উঠল আহ্লাদির ভার ঘাড়ে পড়ায়। নিজের পেট ভরানো শুধু নয়, নিজেদের বেঁচে থাকা শুধু নয়, তাদের দুজনেরই এখন আহ্লাদি আছে। খাইয়ে পরিয়ে যত্নে রাখতে হবে তাকে, শ্বশুরঘরের কবল থেকে বাঁচাতে হবে তাকে, গাঁয়ের বজ্জাতদের নজর থেকে সামলে রাখতে হবে, কত দায়িত্ব তাদের, কত কাজ, কত ভাবনা ।

বাপ মা বেঁচে থাকলে আহ্লাদিকে হয়ত শ্বশুরবাড়ি যেতে হতো, মাসি-পিসিও বিশেষ কিছু বলতো কি না সন্দেহ । কিন্তু তারা তো নেই, এখন মাসি-পিসিরই সব দায়িত্ব। বিনা পরামর্শে আপনা থেকেই তাদের ঠিক হয়েছিল, আহ্লাদিকে পাঠানো হবে না। আহ্লাদিকে কোথাও পাঠানোর কথা তারা ভাবতেও পারে না। বিশেষ করে ওই খুনেদের কাছে কখনো মেয়ে তারা পাঠাতে পারে, যাবার কথা ভাবলেই মেয়ে যখন আতঙ্কে পাঁশুটে মেরে যায়?

বাপের ঘরদুয়ার জমিজমাটুকু আহ্লাদিকে বর্তেছে, জগুর বৌ নেবার আগ্রহও খুবই স্পষ্ট। সামান্যই ছিল তার বাপের, তারও সিকিমতো আছে মোটে, বাকি গেছে গোকুলের কবলে। তবু মুফতে যা পাওয়া যায় তাতেই জগুর প্রবল লোভ । খালি ঘরে আহ্লাদিকে রেখে কোথাও যাবার সাহস তাদের হয় না। দুজনে মিলে যদি যেতে হয় কোথাও আহ্লাদিকে তারা সঙ্গে নিয়ে যায়।

মাসি বলে, ‘ডরানি আহ্লাদি। ভাঁওতা দিয়ে আমাদের দমাবার ফিকির সব। নয় তো কৈলেশকে দিয়ে ওসব কথা বলায় মোদের?’
পিসি বলে,
‘দুদিন বাদে ফের আসবে দেখিস জামাই । তখন শুধোলে বলবে, কই না, আমি তো ওসব কিছু বলি নি কৈলেশকে।’

মাসি বলে, ‘চার মাসে পড়লি, আর কটা দিন বা । মা-মাসির কাছেই রইতে হয় এ সময়টা, জামাই এলে বুঝিয়ে বলব।’ পিসি বলে, ‘ছেলের মুখ দেখে পাষাণ নরম হয়, জানিস আহ্লাদি। তোর পিসে ছিল জগুর মতো। খোকাটা কোলে আসতে কী হয়ে গেল সেই মানুষ। চুপি চুপি এসে এটা ওটা খাওয়ায়, উঠতে বলি তো ওঠে, বসতে বলি তো বসে’ ।
মাসি বলে,
‘তোর মেসো ঠিক ছিল, শাউড়ি ননদ ছিল বাঘ। উঠতে বসতে কী ছ্যাচা খেয়েছি ভাবলে বুক কাঁপে । কিন্তু জানিস আহ্লাদি, মেয়েটা যেই কোলে এল শাউড়ি ননদ যেন মোকে মাথায় করে রাখলে বাঁচে।’

পিসি বলে, ‘তুইও যাবি, সোয়ামির ঘর করবি। ডরানি, ডর কিসের?’

বাড়ি ফিরে দীপ জ্বেলে মাসি-পিসি রান্নাবান্না সারতে লেগে যায়। বাইরে দিন কাটলেও আহ্লাদির পরিশ্রম কিছু হয়নি, শুয়ে বসেই দিন কেটেছে। তবু মাসি-পিসির কথায় সে একটু শোয়। শরীর নয়, মনটা তার কেমন করছে। নিজেকে তার ছ্যাচড়া, নোংরা, নর্দমার মতো লাগে। মাসি-পিসির আড়ালে থেকেও সে টের পায় কীভাবে মানুষের পর মানুষ তাকাচ্ছে তার দিকে, কতজন কতভাবে মাসি-পিসির সঙ্গে আলাপ জমাচ্ছে তরিতরকারির মতো তাকেও কেনা যায় কি না যাচাই করবার জন্য। গাঁয়েরও কতজন তার কত রকমের দর দিয়েছে মাসি-পিসির কাছে। মাসি-পিসিকে চিনে তারা অনেকটা চুপচাপ হয়ে গেছে আজকাল, কিন্তু গোকুল হাল ছাড়েনি। মাসি-পিসিকে পাগল করে তুলেছে গোকুল। মায়ের বাড়া তার এই মাসি-পিসি, কী দুর্ভোগ তাদের তার জন্য। মাসি-পিসিকে এত যন্ত্রণা দেওয়ার চেয়ে সে নয় শ্বশুরঘরের লাঞ্ছনা সইত, জগুর লাথি খেত। ঈষৎ তন্দ্রার ঘোরে শিউরে ওঠে আহ্লাদি। একপাশে মাসি আর একপাশে পিসিকে না নিয়ে শুলে কি চলবে তার কোনোদিন?

রান্না সেরে খাওয়ার আয়োজন করছে মাসি-পিসি, একেবারে ভাতটাত বেড়ে আহ্লাদিকে ডাকবে। ভাগাভাগি কাজ তাদের এমন সহজ হয়ে গেছে যে বলাবলির দরকার তাদের হয় না, দুজনে মিলে কাজ করে যেন একজনে করছে। এবার ব্যঞ্জনে নুন দেবে এ কথা বলতে হয় না পিসিকে, ঠিক সময়ে নুনের পাত্র সে এগিয়ে দেয় মাসির কাছে। বলাবলি করছে তারা আহ্লাদির কথা, আহ্লাদির সুখদুঃখ, আহ্লাদির সমস্যা, আহ্লাদির ভবিষ্যৎ। জামাই যদি আসে, একটি কড়া কথা তাকে বলা হবে না, এতটুকু খোঁচা দেওয়া হবে না । উপদেশ দিতে গেলে চটবে জামাই, পুরুষমানুষ তো যতই হোক, এটা করা তার উচিত নয়, এসব কিছু বলা হবে না তাকে। জামাই এসেছে তাই আনন্দ রাখবার যেন ঠাঁই নেই এই ভাব দেখাবে মাসি-পিসি- আহ্লাদিকে শিখিয়ে দিতে হবে সোয়ামি এসেছে বলে যেন আহ্লাদে গদগদ হবার ভাব দেখায়। যে কদিন থাকে জামাই, সে যেন অনুভব করে, সে-ই এখানকার কর্তা, সে-ই সর্বেসর্বা।

বাইরে থেকে হাঁক আসে কানাই চৌকিদারের। মাসি-পিসি পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়, জোরে নিঃশ্বাস পড়ে দুজনের । সারাটা দিন গেছে লড়ে আর লড়ে। সরকারবাবুর সঙ্গে বাজারের তোলা নিয়ে ঝগড়া করতে অর্ধেক জীবন বেরিয়ে গেছে দু-জনের । এখন এল চৌকিদার কানাই । হাঙ্গামা না আসে রাত্রে, গাঁয়ে লোক যখন ঘুমোচ্ছে ।
রসুই চালায় ঝাঁপ এঁটে মাসি-পিসি বাইরে যায়। শুক্লপক্ষের একাদশীর উপোস করেছে তারা দুজনে গতকাল আজ দ্বাদশী, জ্যোৎস্না বেশ উজ্জ্বল। কানাইয়ের সাথে গোকুলের যে তিনজন পেয়াদা এসেছে তাদের মাসি-পিসি চিনতে পারে, মাথায় লাল পাগড়ি-আঁটা লোকটা তাদের অচেনা । কানাই বলে,
‘কাছারিবাড়ি যেতে হবে একবার।

মাসি বলে, ‘এত রাতে?’
পিসি বলে,
‘মরণ নেই ?

কানাই বলে, ‘দারোগাবাবু এসে বসে আছেন বাবুর সাথে। যেতে একবার হবেগো দিদিঠাকরুনরা। বেঁধে নিয়ে যাবার হুকুম আছে।’
মাসি-পিসি মুখে মুখে তাকায়। পথের পাশে ডোবার ধারে কাঁঠাল গাছের ছায়ায় তিন-চারজন ঘুপটি মেরে আছে স্পষ্টই দেখতে পেয়েছে মাসি-পিসি। ওরা যে গাঁয়ের গুন্ডা সাধু বৈদ্য ওসমানেরা তাতে সন্দেহ নেই, বৈদ্যের ফেটি-বাঁধা বাবরি চুলওয়ালা মাথাটায় পাতার ফাঁকে জ্যোৎস্না পড়েছে। তারা যাবে কাছারিতে কানাই আর পেয়াদা কনস্টেবলের সঙ্গে। ওরা এসে আহ্লাদিকে নিয়ে যাবে। মাসি বলে,
‘মোদের একজন গেলে হবে না কানাই?”

পিসি বলে, ‘আমি যাই চলো?’
কর্তা ডেকেছেন দুজনকে।
মাসি-পিসি দুজনেই আবার তাকায় মুখে মুখে ।

মাসি বলে, ‘কাপড়টা ছেড়ে আসি কানাই । পিসি বলে, ‘হাত ধুয়ে আসি, একদণ্ড লাগবে না।’
তাড়াতাড়িই ফিরে আসে তারা। মাসি নিয়ে আসে বঁটিটা হাতে করে, পিসির হাতে দেখা যায় রামদার মতো মস্ত একটা কাটারি ।
মাসি বলে,
‘কানাই, কত্তাকে বোলো, মেয়েনোকের এত রাতে কাছারিবাড়ি যেতে নজ্জা করে । কাল সকালে যাব।’
পিসি বলে,
‘এত রাতে মেয়েনোককে কাছারিবাড়ি ডাকতে কত্তার নজ্জা করে না কানাই ? কানাই ফুঁসে ওঠে, ‘না যদি যাও ঠাকরুনরা ভালোয় ভালোয়, ধরে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবার হুকুম আছে কিন্তু বলে রাখলাম।’

মাসি বঁটিটা বাগিয়ে ধরে দাঁতে দাঁত কামড়ে বলে, ‘বটে? ধরে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবে? এসো। কে এগিয়ে আসবে এসো। বঁটির এক কোপে গলা ফাঁক করে দেব।’ পিসি বলে, ‘আয় না বজ্জাত হারামজাদারা, এগিয়ে আয় না? কাটারির কোপে গলা কাটি দু-একটার।’

দু-পা এগোয় তারা দ্বিধাভরে। মাসি-পিসির মধ্যে ভয়ের লেশটুকু না দেখে সত্যিই তারা খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা
খেয়ে গিয়েছে। মারাত্মক ভঙ্গিতে বঁটি আর দা উঁচু হয় মাসি-পিসির।
মাসি বলে,
‘শোনো কানাই, এ কিন্তু এর্কি নয় মোটে । তোমাদের সাথে মোরা মেয়েনোক পারব না জানি কিন্তু দুটো-একটাকে মারব জখম করব ঠিক।’
পিসি বলে,
‘মোরা নয় মরব।’
তারপর বিনা পরামর্শেই মাসি-পিসি হঠাৎ গলা ছেড়ে দেয়। প্রথমে শুরু করে মাসি, তারপর যোগ দেয় পিসি ।
আশপাশে যত বাসিন্দা আছে সকলের নাম ধরে গলা ফাটিয়ে তারা হাঁক দেয়, ও বাবাঠাকুর! ও ঘোষ মশায় !
ও জনাদ্দন! ওগো কানুর মা! বিপিন! বংশী
….
কানাই অদৃশ্য হয়ে যায় দলবল নিয়ে। হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি শুরু হয়ে যায় পাড়ায়, অনেকে ছুটে আসে, কেউ কেউ ব্যাপার অনুমান করে ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দেয় বাইরে না বেরিয়ে

এই হট্টগোলের পর আরও নিঝুম আরও থমথমে মনে হয় রাত্রিটা। আহ্লাদিকে মাঝখানে নিয়ে শুয়ে ঘুম আসে না মাসি-পিসির চোখে। বিপদে পড়ে হাঁক দিলে পাড়ার এত লোক ছুটে আসে, এমনভাবে প্রাণ খুলে এতখানি জ্বালার সঙ্গে নিজেদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে গোকুল আর দারোগা ব্যাটার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে সাহস পায়, জানা ছিল না মাসি-পিসির । তারা হাঁকডাক শুরু করেছিল খানিকটা কানাইদের ভড়কে দেবার জন্যে, এত লোক এসে পড়বে আশা করেনি। তাদের জন্য যতটা নয়, গোকুল আর দারোগার ওপর রাগের জ্বালাই যেন ওদের ঘর থেকে টেনে বার করে এনেছে মনে হলো সকলের কথাবার্তা শুনে। কেমন একটা স্বস্তি বোধ করে মাসি-পিসি। বুকে নতুন জোর পায় ।
মাসি বলে,
‘জানো বেয়াইন, ওরা ফের ঘুরে আসবে মন বলছে। এত সহজে ছাড়বে কি ।’ পিসি বলে, ‘তাই ভাবছিলাম। মেয়েটাকে কুটুমবাড়ি সরিয়ে দেওয়ায় সোনাদের ঘরে মাঝরাতে আগুন ধরিয়েছিল সেবার।’

খানিক চুপচাপ ভাবে দুজনে ৷
মাসি বলে,
‘সজাগ রইতে হবে রাতটা।’
পিসি বলে,
‘তাই ভালো। কাঁথা কম্বলটা চুবিয়ে রাখি জলে, কী জানি কী হয়।’

আস্তে চুপি চুপি তারা কথা কয়, আহ্লাদির ঘুম না ভাঙে। অতি সন্তর্পণে তারা বিছানা ছেড়ে ওঠে। আহ্লাদির বাপের আমলের গোরুটা নেই, গামলাটা আছে। ঘড়া থেকে জল ঢেলে মোটা কাঁথা আর পুরনো ছেঁড়া একটা কম্বল চুবিয়ে রাখে, চালায় আগুন ধরে উঠতে উঠতে গোড়ায় চাপা দিয়ে নেভানো যাতে সহজ হয়। ঘড়ায় আর হাঁড়ি কলসিতে আরও জল এনে রাখে তারা ডোবা থেকে । বঁটি আর দা রাখে হাতের কাছেই । যুদ্ধের আয়োজন করে তৈরি হয়ে থাকে মাসি-পিসি ।

মাসি পিসি গল্পের মূলভাব

“মাসি-পিসি” গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় কলকাতার ‘পূর্বাশা’ পত্রিকায় ১৩৫২ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যায় (মার্চ-এপ্রিল ১৯৪৬)। পরে এটি সংকলিত হয় ‘পরিস্থিতি’ (অক্টোবর ১৯৪৬) নামক গল্পগ্রন্থে। বর্তমান পাঠ গ্রহণ করা হয়েছে ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশিত মানিক-রচনাবলি পঞ্চম খণ্ড থেকে । স্বামীর নির্মম নির্যাতনের শিকার পিতৃমাতৃহীন এক তরুণীর করুণ জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে “মাসি-পিসি” গল্প। আহ্লাদি নামক ওই তরুণীর মাসি ও পিসি দুজনই বিধবা ও নিঃস্ব। তারা তাদের অস্তিত্বরক্ষার পাশাপাশি বিরূপ বিশ্ব থেকে আহ্লাদিকে রক্ষার জন্য যে বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী সংগ্রাম পরিচালনা করে সেটাই গল্পটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। অত্যাচারী স্বামী এবং লালসা-উন্মত্ত জোতদার, দারোগা ও গুন্ডা-বদমাশদের আক্রমণ থেকে আহ্লাদিকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে অসহায় দুই বিধবার দায়িত্বশীল ও মানবিক জীবনযুদ্ধ খুবই প্রশংসনীয়। দুর্ভিক্ষের মর্মস্পর্শী স্মৃতি, জীবিকা নির্বাহের কঠিন সংগ্রাম, নারী হয়ে নৌকাচালনা ও সবজির ব্যবসায় পরিচালনা প্রভৃতি এ গল্পের বৈচিত্র্যময় দিক।

 

📝 লেখক পরিচিতি: এক নজরে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম: ১৯ মে, ১৯০৮ (দুমকা, বিহার)।

পৈতৃক নিবাস: ঢাকা জেলার বিক্রমপুর।

আসল নাম: প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রথম গল্প: ২০ বছর বয়সে বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে লেখা 'অতসীমামী'।

বিখ্যাত উপন্যাস: পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য।

জীবনদর্শন: তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক এবং মানুষের অবচেতন মনের জটিলতার রূপকার।

 

📖 গল্পের মূল উপজীব্য

স্বামী জগুর অমানুষিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে পিতৃহীন তরুণী আহ্লাদি তার মাসি ও পিসির কাছে আশ্রয় নেয়। এই দুই বিধবা নারী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার পাশাপাশি আহ্লাদিকে সমাজের লোলুপ দৃষ্টি এবং তার অত্যাচারী স্বামীর কবল থেকে বাঁচাতে যে সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাই এই গল্পের মূল বিষয়।

 


মাসি পিসি গল্পের আরও কিছু জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

 

১. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেন?  উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯শে মে জন্মগ্রহণ করেন।

২. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃপ্রদত্ত নাম কী? উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃপ্রদত্ত নাম হলো প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

৩. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কত বছর বেঁচেছিলেন?  উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ৪৮ বছর বেঁচেছিলেন।

৪. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গল্পের নাম কী?  উত্তর: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গল্পের নাম ‘অতসীমামী’।

৫. সালতি কোথায় লাগানো ছিল?  উত্তর: সালতি কংক্রিটের পুলের কাছে খালের ধারে লাগানো ছিল। .

৬. কয়জন লোক আঁটিবাঁধা খড় ওপরে ওঠাচ্ছিল?  উত্তর: তিনজন লোক আঁটিবাঁধা খড় ওপরে ওঠাচ্ছিল।

৭. কার মাথায় কদমছাঁটা রুক্ষ চুল?  উত্তর: কৈলাশের মাথায় কদমছাটা রুক্ষ চুল।

৮. ‘বেলা আর নেই কৈলেশ’—উক্তিটি কার?  উত্তর: ‘বেলা আর নেই কৈলেশ’- উক্তিটি মাসির।

৯. কে আহ্লাদিকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর কথা বলেছে?  উত্তর: কৈলাশ আহ্লাদিকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর কথা বলেছে।

১০. ‘খুনসুটি রাখো দিকি কৈলেশ তোমার।’—উক্তিটি কার?  উত্তর: ‘খুনসুটি রাখো দিকি কৈলেশ তোমার’- উক্তিটি মাসির।

১১. আহ্লাদির স্বামীর নাম কী?  উত্তর: আহ্লাদির স্বামীর নাম জগু।

১২. চায়ের দোকানে কৈলেশের সাথে কার দেখা হয়েছিল?  উত্তর: চায়ের দোকানে কৈলাশের সাথে জগুর দেখা হয়েছিল।

১৩. কৈলাশের সাথে জগুর কোথায় দেখা হয়েছে?  উত্তর: কৈলাশের সাথে জগুর চায়ের দোকানে দেখা হয়েছে।

১৪. কখন কৈলাশের স্বভাব বিগড়ে যায়?  উত্তর: হাতে দুটো পয়সা এলে কৈলাশের স্বভাব বিগড়ে যায়।

১৫. পিসির মতে, জগু বারো মাস কোথায় পড়ে থাকে?  উত্তর: পিসির মতে, জগু বারো মাস শুঁড়িখানায় পড়ে থাকে।

১৬. জগুর বউয়ের নাম কী?  উত্তর: জগুর বউয়ের নাম আহ্লাদি।

১৭. ‘বজ্জাত হোক, খুনে হোক, জামাই তো’—উক্তিটি কার?  উত্তর: ‘বজ্জাত হোক, খুনে হোক, জামাই তো’- উক্তিটি মাসির।

১৮. ‘মাসি-পিসি’ গল্পের বুড়ো লোকটির নাম কী?  উত্তর: ‘মাসি-পিসি’ গল্পের বুড়ো লোকটির নাম- রহমান।

১৯. কে বাহকদের মাথায় খড় চাপিয়ে যায়?  উত্তর: বুড়ো রহমান বাহকদের মাথায় খড় চাপিয়ে যায়।

২০. বুড়ো রহমানের মেয়ে কোথায় মারা গেছে?  উত্তর: বুড়ো রহমানের মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে মারা গেছে।

২১. কে সালতির সামনের দিকে ছিল? উত্তর: মাসি সালতির সামনের দিকে ছিল।

২২. ‘মাসি-পিসি’ গল্পে শকুনেরা উড়ে এসে কোথায় বসে? উত্তর: ‘মাসি-পিসি’ গল্পে শকুনেরা উড়ে এসে পাতাশূন্য শুকনো গাছটায় বসে।

২৪. আহ্লাদির বাবা কোন রোগে মারা যায়?  উত্তর: আহ্লাদির বাবা কলেরা রোগে মারা যায়।

২৫. আহ্লাদির পরিবার-পরিজন কীভাবে মারা গিয়েছিল?   উত্তর: আহ্লাদির পরিবার-পরিজন কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল।

২৬. কাদের সেবাযতেœ আহ্লাদি বেঁচে গিয়েছিল?  উত্তর: মাসি-পিসির সেবাযতেœ আহ্লাদি বেঁচে গিয়েছিল।

২৭. মাসি পিসিকে কী বলে সম্বোধন করত?  উত্তর: মাসি পিসিকে বেয়াইন বলে সম্বোধন করত।

২৮. কোথায় তরিতরকারি ও ফলমূলের দাম চড়া ছিল?  উত্তর: শহরে তরিতরকারি ও ফলমূলের দাম চড়া ছিল।

২৯. মাসি-পিসি কীভাবে শহরে যেত? উত্তর: মাসি-পিসি সালতি বেয়ে শহরে যেত।

৩০. আহ্লাদির জমি-জমার অধিকাংশ কার দখলে চলে গেছে?  উত্তর: আহ্লাদির জমি-জমার অধিকাংশ গোকুলের দখলে চলে গেছে।

 

 

মাসি পিসি গল্পের সৃজনশীল সাজেশন

 

সৃজনশীল—১: নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
সাবিনা ও রেহানা দুই বোন। দুজনেরই স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাইয়ের কাছে এসে আশ্রয় নেয়। ভাইয়ের দরিদ্র সংসারে তারা নিজেদের বোঝা মনে করে, তাই জীবিকার ভিন্ন পথ খোঁজ করে এবং পেয়েও যায়। গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাঁস-মুরগির ডিম কিনে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে, যা আয় করে তা ভাইয়ের হাতে তুলে দেয়। ক্রমে তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসে।

ক. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কত বছর বয়সে প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ রচনা করেন?
খ. রাতের বেলা কানাই পেয়াদা নিয়ে আসে কেন?
গ. উদ্দীপকের সাবিনা ও রেহানা
‘মাসি-পিসি’ গল্পের কোন বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ঘ. উদ্দীপকটি
‘মাসি-পিসি’ গল্পের আংশিক ভাব ধারণ করেছে মাত্র।”—মন্তব্যটি বিচার কর।

 

সৃজনশীল—২: নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
হাসু ও মায়মুনকে নিয়ে ভেসেই চলছিল জয়গুন। কিন্তু নিজের চেষ্টায় অকূল পাথারে সে কূল পায়। লজ্জাশরম বিসর্জন দিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজে। তাকে বাঁচতে হবে। ছেলেমেয়েকে বাঁচাতে হবে। এই সংকল্প নিয়ে আকালের পাঁচ বছর সে লড়াই করে আসছে।

ক. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক নিবাস কোথায়?
খ. আহ্লাদিকে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যেতে হয় কেন?
গ. উদ্দীপকের জয়গুনের সাথে
‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি-পিসির কোন দিক দিয়ে সাদৃশ্য রয়েছে?
ঘ. সাদৃশ্য থাকলেও জয়গুন গল্পের মাসি-পিসির সমগ্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারেনি। মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।

 

সৃজনশীল—৩: নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মা তাকে জেরা করলেন। দেখলাম সে ভারি চাপা। মার প্রশ্নের ছাঁকা জবাব দিল, নিজে থেকে একটি কথা বেশি কইল না। সে বলল, তার নাম মমতা। আমাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে জীবনময়ের গলি, গলির ভেতরে সাতাশ নম্বর বাড়ির একতলায় সে থাকে। তার স্বামী আছে আর একটি ছেলে। স্বামীর চাকরি নেই চারমাস, সংসার আর চলে না, সে তাই পর্দা ঠেলে উপার্জনের জন্য বাইরে এসেছে। এই তার প্রথম চাকরি। মাইনে? সে তা জানে না। দুবেলা রেঁধে দিয়ে যাবে কিন্তু খাবে না।

ক. মাসি-পিসি কীভাবে শহরে যেতেন?
খ. মাসি-পিসির জমানো টাকা কেন খরচ হয়ে গিয়েছিল?
গ. উদ্দীপকের মমতা
‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি-পিসির কোন বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে? আলোচনা কর।
ঘ. উদ্দীপকটি
‘মাসি-পিসি’ গল্পের সম্পূর্ণ ভাব ধারণ করে কি? তোমার মতের পক্ষে যুক্তি দাও।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.