Header Ads

মুনশি একাডেমি

শিক্ষা ও সাহিত্যভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
নোট ও সাজেশন বিসিএস ও এনটিআরসিএ বি.এড ও ব্যাংক প্রস্তুতি

চর্যাপদের ভাষা ও সাহিত্য: হাজার বছরের বাঙালি হৃদস্পন্দন

 চর্যাপদের ভাষা ও সাহিত্য: হাজার বছরের বাঙালি হৃদস্পন্দন

 
চর্যাপদ, বাংলা সাহিত্য, প্রাচীন যুগ, চর্যাপদের ভাষা ও সমাজ,charyapada-language

ভূমিকা

বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রথম লিখিত দলিল হলো চর্যাপদ। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকে এই অমূল্য রতনটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন সংগীত। কিন্তু এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সেকালের সমাজ, প্রকৃতি এবং আমাদের আদি বাংলা ভাষার রূপরেখা।

 

চর্যাপদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সাধারণ মতে এটি অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত। পাল রাজবংশের শাসনামলে যখন বৌদ্ধধর্মের বিকশিত রূপ 'সহজযান' বাংলায় জনপ্রিয় ছিল, তখন সিদ্ধাচার্যরা তাদের সাধন-ভজনের তাত্ত্বিক কথাগুলো এই পদগুলোর মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিষ্কৃত পুঁথিটিতে মোট ৪৬টি পূর্ণাঙ্গ এবং একটি খন্ডিত পদ ছিল।

 

ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘আলো-আঁধারি’

চর্যাপদের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হলো এর নাম— ‘সান্ধ্য ভাষা’। এর অর্থ হলো এমন এক ভাষা যা আংশিক বোঝা যায় এবং আংশিক অস্পষ্ট। এর কারণ হলো পদকর্তারা চেয়েছিলেন তাদের গুহ্য সাধনপদ্ধতি যেন সাধারণ মানুষের কাছে গোপন থাকে অথচ সাধকদের কাছে পরিষ্কার হয়।

  • বাংলা ভাষার আদি রূপ: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার ‘The Origin and Development of the Bengali Language’ (ODBL) গ্রন্থে ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে চর্যাপদের ভাষা মূলত প্রাচীন বাংলা। এতে অপভ্রংশ ও অবহট্টের প্রভাব থাকলেও এর ক্রিয়াপদ, বিভক্তি এবং সর্বনাম পদগুলো বাংলার আদি রূপকে নির্দেশ করে।

  • অসমীয়া ও ওড়িয়া বিতর্ক: একটা সময় আসাম এবং ওড়িশার পন্ডিতরা চর্যাপদকে তাদের নিজেদের ভাষার নিদর্শন দাবি করেছিলেন। তবে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান এটি প্রমাণ করেছে যে, পূর্ব-মাগধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত এই ভাষাটি বাংলার সবচেয়ে নিকটবর্তী।

     

চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল্য

চর্যাপদ কেবল ধর্মের কথা নয়, এটি উচ্চমানের কাব্যগুণসম্পন্ন। এই পদগুলোর মধ্যে চিত্রকল্প, রূপক এবং উপমার ব্যবহার মুগ্ধ করার মতো।

১. উপমার প্রয়োগ: ‘কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল’ (কায় তরুবর সম, পঞ্চ তার ডাল) — দেহকে একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এমন অসংখ্য উপমা চর্যাপদকে কালজয়ী সাহিত্যে রূপ দিয়েছে।

২. জীবনবোধ: জীবন যে নশ্বর এবং চঞ্চল, তা বোঝাতে সিদ্ধাচার্যরা বলছেন— ‘চঞ্চল চীএ পইঠো কাল’ অর্থাৎ মন চঞ্চল হলেই কাল (মৃত্যু) প্রবেশ করে।

 

তৎকালীন সমাজ ও জীবনের প্রতিফলন

চর্যাপদের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর সমাজচিত্র। ধর্মতত্ত্বের আড়ালে প্রাচীন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন এখানে সজীব হয়ে উঠেছে।

  • নিম্নবিত্তের জীবন: ডোম, শবর, চন্ডালদের জীবনের চিত্র এখানে প্রধান। নগরের বাইরে উঁচু টিলায় বসবাসকারী শবরী বালিকার চিত্র কিংবা নৌকা বাওয়া, সাঁকো তৈরি, তাঁত বোনার বর্ণনায় সাধারণ মানুষের শ্রমঘন জীবন ফুটে উঠেছে।

  • দারিদ্র্য ও হাহাকার: ৩৩ নম্বর পদে লুইপাদ লিখেছেন— ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী / হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী’। অর্থাৎ পাহাড়ের চূড়ায় আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই, কিন্তু প্রেমিকের আনাগোনা নিত্যদিন। এটি তৎকালীন দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের এক করুণ ও বাস্তব ছবি।

  • পারিবারিক জীবন: মা, মেয়ে, পুত্রবধূ এবং যৌতুক প্রথার উল্লেখও পাওয়া যায় চর্যাপদে। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে ঘরকন্নার জিনিসপত্র দেওয়ার রেওয়াজ যে প্রাচীন, তা এখানকার পদ থেকে বোঝা যায়।

     

ছন্দ ও সংগীত

চর্যাপদ মূলত গীত। প্রতিটি পদের শুরুতে নির্দিষ্ট রাগের নাম উল্লেখ আছে (যেমন— পটমঞ্জরী, গবড়া, ধানশী)। এগুলো মূলত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। চর্যাপদের এই সংগীতময়তা পরবর্তীকালে বৈষ্ণব পদাবলী এবং বাউল গানে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

 

আধুনিক বাংলায় চর্যাপদের গুরুত্ব

আজকের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের বারবার চর্যাপদে ফিরে যেতে হয়। চর্যাপদ প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা কোনো আকস্মিক সৃষ্টি নয়, বরং এটি দীর্ঘ বিবর্তনের ফসল। এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনারও প্রাথমিক উৎস, যেখানে উচ্চবর্ণের শাসনের বাইরে ব্রাত্যজন বা সাধারণ মানুষের জীবনকে মহিমান্বিত করা হয়েছে।

চর্যাপদ আমাদের অহংকার। নেপালের ধুলোবালি মাখা অন্ধকার ঘর থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যদি এই পুঁথি উদ্ধার না করতেন, তবে আমাদের ভাষার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত। হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে কথা বলতেন, কীভাবে ভাবতেন এবং কেমন ছিল তাদের দুঃখ-সুখ, তার একমাত্র জীবন্ত দলিল এই চর্যাপদ। এর ভাষা ও সাহিত্যের বিশালতা আজও আমাদের গবেষণার খোরাক জোগায় এবং বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্বিত করে।


 

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.