চর্যাপদের রচয়িতা ও সিদ্ধাচার্যগণ: একটি নিবিড় বিশ্লেষণ
চর্যাপদের রচয়িতা ও সিদ্ধাচার্যগণ: একটি নিবিড় বিশ্লেষণ
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সূচনালগ্নে যে নামগুলো ধ্রুবতারার মতো জ্বলে আছে, তাঁরা হলেন চর্যাপদের রচয়িতা বা সিদ্ধাচার্যগণ। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক আবিষ্কৃত এই পদগুলো মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া পন্থীদের সাধন-সংগীত। এই সিদ্ধাচার্যগণ কেবল ধর্মীয় সাধক ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন আদি বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁদের পদের মাধ্যমেই বাংলা ভাষা প্রথম তার কাব্যিক অবয়ব লাভ করে।
১. সিদ্ধাচার্য কারা?
'সিদ্ধাচার্য' শব্দটির অর্থ হলো যিনি 'সিদ্ধি' বা পরম জ্ঞান লাভ করেছেন এবং যিনি 'আচার্য' বা শিক্ষক। তিব্বতি ঐতিহ্য অনুসারে ৮৪ জন সিদ্ধাচার্যের কথা জানা গেলেও চর্যাপদের পুথিতে ২৪ জন কবির নাম পাওয়া যায়। তাঁরা সমাজের উঁচু-নিচু সব শ্রেণি থেকে এসেছিলেন এবং তাঁদের জীবনদর্শন ছিল লৌকিক ও মরমী।
২. চর্যাপদের প্রধান রচয়িতা ও তাঁদের অবদান
চর্যাপদের মোট ৫০টি পদের (সাড়ে ৪৬টি প্রাপ্ত) মধ্যে প্রধান কয়েকজন সিদ্ধাচার্যের পরিচয় নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. লুইপা (Luipa)
চর্যাপদের প্রথম পদের রচয়িতা হিসেবে লুইপাকে এই সংকলনের আদি কবি বা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো হয়।
পরিচয়: তিব্বতি জনশ্রুতি অনুযায়ী তিনি ছিলেন রাজা ধর্মপালের লেখক। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন তিনি পাল যুগের শুরুতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে বা ওড়িশায় জন্মগ্রহণ করেন।
কাব্যশৈলী: তাঁর পদগুলো গভীর তাত্ত্বিক কিন্তু উপমায় সমৃদ্ধ। তাঁর প্রথম পদের বিখ্যাত চরণ—
“কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল।।” এখানে তিনি মানবদেহকে বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করে সময়ের নশ্বরতাকে বুঝিয়েছেন।
খ. কাহ্নপা (Kahnapa)
চর্যাপদের সবচেয়ে বেশি পদের রচয়িতা হলেন কাহ্নপা। তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ১৩টি।
পরিচয়: তাঁকে কৃষ্ণপাদ বা কাহ্নু নামেও ডাকা হয়। তিনি সমাজের তথাকথিত নিচুতলার মানুষের জীবনকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
বৈশিষ্ট্য: কাহ্নপার পদে আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে কাব্যিক সংবেদনশীলতা বেশি। তিনি ডোম নারীর প্রতি আকর্ষণকে রূপক করে নির্বাণ লাভের তত্ত্ব প্রচার করেছেন।
গ. ভুসুকুপা (Bhushukupa)
ভুসুকুপা চর্যাপদের দ্বিতীয় বৃহত্তম রচয়িতা (৮টি পদ)। তিনি নিজেকে ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে অমর হয়ে আছেন।
বিখ্যাত উক্তি: > “আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী। বিঅণি সহঅজে ণিঅ ঘরিণী লইলী।।” এই চরণটি প্রমাণ করে যে চর্যাপদের ভাষা ও রচয়িতাদের শেকড় বাংলা ভূমিতেই প্রোথিত। তাঁর বর্ণনায় বাংলার প্রকৃতি ও শিকারি জীবনের চিত্র পাওয়া যায়।
ঘ. শবরপা (Shabarpa)
শবরপা ছিলেন একজন আদিবাসী বা শবর জনগোষ্ঠীর সাধক।
দর্শন: তাঁর পদে পাহাড়, অরণ্য এবং ব্যাধদের জীবনচিত্র প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি উঁঁচু পাহাড়ের চূড়ায় বাস করা শবরী বালিকার রূপকের মাধ্যমে মহাসুখ বা পরমানন্দের কথা বলেছেন।
৩. সিদ্ধাচার্যদের জীবনদর্শন ও 'সন্ধ্যা ভাষা'
সিদ্ধাচার্যগণ তাঁদের তত্ত্বকথা প্রচারের জন্য এক বিশেষ ধরনের সংকেতময় ভাষা ব্যবহার করতেন, যাকে বলা হয় 'সন্ধ্যা ভাষা' (Intentional Language)। এর কারণ ছিল দুটি:
১. বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনা ছিল অত্যন্ত গোপনীয়, যা সাধারণের কাছে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল।
২. আধ্যাত্মিক অনুভুতিকে সাধারণ জাগতিক শব্দ দিয়ে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এই ভাষায় প্রতিটি শব্দের দুটি অর্থ থাকে—একটি বাহ্যিক (Linguistic) এবং অন্যটি অভ্যন্তরীণ (Philosophical)। যেমন: 'নৌকা' মানে সাধনপদ্ধতি, আর 'মাঝি' মানে গুরু।
৪. ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের সংক্ষিপ্ত তালিকা ও পদ সংখ্যা
চর্যাপদে যাঁদের নাম ও পদের সন্ধান পাওয়া যায় তাঁরা হলেন:
| রচয়িতার নাম | পদের সংখ্যা | বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
| কাহ্নপা | ১৩টি | সর্বাধিক পদের রচয়িতা |
| ভুসুকুপা | ৮টি | নিজেকে বাঙালি বলে দাবি করেছেন |
| সরহপা | ৪টি | সহজিয়া মতবাদের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক |
| কুক্কুরীপা | ৩টি | পদের অর্থ অত্যন্ত জটিল ও রহস্যময় |
| লুইপা | ২টি | চর্যাপদের আদি কবি |
| শান্তিণা | ২টি | দার্শনিক ও পন্ডিত হিসেবে পরিচিত |
| শবরপা | ২টি | আদিবাসী জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন |
| অন্যান্য (১৮ জন) | ১টি করে | বিরূপা, গুণ্ডরীপা, চাটীলপা, কামলীপা প্রমুখ |
৫. সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সিদ্ধাচার্যগণ পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তাঁদের সমাজ ছিল বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। ডোম, চণ্ডাল, শবরদের জীবনকে মহিমান্বিত করার মাধ্যমে তাঁরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আধ্যাত্মিক ধারার সূচনা করেন। তৎকালীন বাংলার বৌদ্ধ ধর্ম ও হিন্দু ধর্মের তান্ত্রিক ধারার এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায় এই রচয়িতাদের মধ্যে।
৬. চর্যাপদের রচয়িতাদের আধুনিক গুরুত্ব
বর্তমান বাংলা সাহিত্যের যে শাখাগুলো আমরা দেখি—কবিতা, গান বা মরমী সাহিত্য—সবকিছুর উৎস এই সিদ্ধাচার্যগণ। লালন শাহ বা হাছন রাজার গানের যে 'দেহবাদী' দর্শন, তার আদি রূপ পাওয়া যায় সরহপা বা কাহ্নপার পদে। তাঁরাই প্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে বাংলা ভাষা কেবল ঘরের কথা বলার জন্য নয়, বরং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গূঢ় রহস্য প্রকাশের জন্য এক শক্তিশালী মাধ্যম।
চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যগণ কেবল বৌদ্ধ ধর্মের সাধক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন বাংলা ভাষার প্রথম কারিগর। তাঁদের হাত ধরেই বাংলা ভাষা তার শৈশব পার করে যৌবনে পা রেখেছিল। লুইপা থেকে শুরু করে ভুসুকুপা পর্যন্ত প্রতিটি কবি তাঁদের পদের মাধ্যমে আদি বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে অমর করে রেখেছেন। আজ এক হাজার বছর পরেও যখন আমরা তাঁদের পদ পড়ি, তখন মনে হয় এ যেন আমাদেরই পূর্বপুরুষদের রক্তমাংসে গড়া এক জীবন্ত দলিল।
তথ্যসূত্র:
১. চর্যাগীতি পদাবলী – ড. সুকুমার সেন।
২. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত – ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
৩. হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা – হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
৪. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

কোন মন্তব্য নেই