আম গবেষণা কেন্দ্র: চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের জীবন্ত সংগ্রহশালা
আম গবেষণা কেন্দ্র: চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ঐতিহ্যের জীবন্ত সংগ্রহশালা
ভূমিকা
বাংলাদেশের আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র (Regional Horticulture Research Station) বা আম গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি বাংলাদেশের আম চাষ ও উন্নত জাত উদ্ভাবনের প্রধান গবেষণাগার হিসেবে পরিচিত। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই কেন্দ্রে রয়েছে শত শত প্রজাতির দেশি-বিদেশি আমের বাগান। এটি কেবল একটি গবেষণা কেন্দ্র নয়, বরং পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণের জায়গা, যেখানে একসাথে শত শত জাতের আমের সমারোহ দেখা যায়। বিলুপ্তপ্রায় আম থেকে শুরু করে হাড়িবাঙ্গা, ল্যাংড়া, গোপালভোগ কিংবা থাইল্যান্ডের উন্নত জাত—সবকিছুর প্রদর্শনী এখানে মেলে। আমের মৌসুমে যখন গাছগুলো ফলে ভরে ওঠে, তখন পুরো এলাকায় এক অপার্থিব সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এটি কৃষি পর্যটন বা এগ্রো-ট্যুরিজমের জন্য বাংলাদেশের সেরা জায়গাগুলোর একটি।
কোথায় অবস্থিত?
এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালিনগর এলাকায় অবস্থিত। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এবং জেলা শহর থেকে রিকশা বা ইজিবাইকে খুব সহজেই পৌঁছানো যায়।
কেন যাবেন?
আমের বৈচিত্র্য দেখা: একসাথে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি প্রজাতির আমের গাছ ও ফল দেখার জন্য।
কৃষি জ্ঞান অর্জন: আমের গ্রাফটিং বা কলম পদ্ধতি এবং আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে।
প্রকৃতি ভ্রমণ: সারি সারি আম গাছের নিচে নির্মল ও শীতল পরিবেশে সময় কাটাতে।
বিলুপ্ত জাতের সন্ধান: প্রাচীন ও বিলুপ্তপ্রায় অনেক প্রজাতির আমের জিন ব্যাংক বা মাতৃ বাগান দেখার জন্য।
কখন যাবেন?
আম গবেষণা কেন্দ্র ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো গ্রীষ্মকাল (এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত)। এই সময়ে গাছগুলো আমে ঠাসা থাকে এবং আপনি সরাসরি ফলের সমারোহ দেখতে পাবেন। তবে বসন্তকালে আমের মুকুলের সুবাস নিতেও অনেকে এখানে যান।
কীভাবে যাবেন / রুট (স্টেপ বাই স্টেপ)
১. ঢাকা থেকে: ঢাকা (গাবতলী বা কল্যাণপুর) থেকে সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী বাসে (দেশ ট্রাভেলস, হানিফ, শ্যামলী) চড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে নামতে হবে।
২. শহর থেকে: চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর বা বিশ্বরোড মোড় থেকে যেকোনো রিকশা বা ইজিবাইকে করে 'আম গবেষণা কেন্দ্র' বললেই আপনাকে গেটে নামিয়ে দেবে। শহর থেকে সময় লাগে মাত্র ১০-১৫ মিনিট।
৩. রাজশাহী থেকে: রাজশাহী শহর থেকে লোকাল বাস বা ট্রেনে করে মাত্র ১-১.৫ ঘণ্টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌঁছে এখানে আসা যায়।
কী দেখবেন?
আমের বাগান: মাইলের পর মাইল বিস্তৃত আম বাগান।
জার্মপ্লাজম সেন্টার: যেখানে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি জাতের আমের জিন সংরক্ষণ করা হয়।
কলম বাগান: আধুনিক গ্রাফটিং পদ্ধতিতে তৈরি করা ছোট ছোট গাছে বড় বড় আমের দৃশ্য।
নার্সারি: যেখান থেকে উন্নত জাতের আমের চারা সংগ্রহ করা যায়।
খরচ
প্রবেশ ফি: এটি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সাধারণত দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট লাগে না (তবে বিশেষ ক্ষেত্রে বা দলগত ভ্রমণের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে)।
যাতায়াত: শহর থেকে রিকশা বা অটো ভাড়া জনপ্রতি ১৫-৩০ টাকা।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা
পরিবহন: রিকশা, অটো-রিকশা এবং ইজিবাইক।
খাবার: কেন্দ্রের আশেপাশে ছোট খাবারের দোকান আছে। তবে ভালো মানের খাবারের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের 'হোটেল স্কাই ভিউ' বা 'বিসমিল্লাহ হোটেল' বেশ জনপ্রিয়। এখানকার বিখ্যাত 'কালাই রুটি ও বেগুন ভর্তা' অবশ্যই ট্রাই করবেন।
যোগাযোগ ও আবাসন ব্যবস্থা
আবাসন: রাত্রিযাপনের জন্য জেলা সদরে 'হোটেল রোজ', 'হোটেল আল-নাহিদ' বা 'পর্যটন মোটেল' রয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ডাকবাংলোর ব্যবস্থা আছে।
যোগাযোগ: কোনো শিক্ষা সফর বা প্রাতিষ্ঠানিক ভ্রমণের জন্য কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দপ্তরে আগে থেকে যোগাযোগ করা ভালো।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা
গাছের আম ছেঁড়া বা নষ্ট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
গবেষণার কাজে ব্যবহৃত কোনো যন্ত্রপাতিতে হাত দেবেন না।
বাগান এলাকায় ধূমপান বা আগুন জ্বালানো থেকে বিরত থাকুন।
প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
মহানন্দা নদীর তীর।
ছোট সোনা মসজিদ (শিবগঞ্জ)।
বাবুডাইং (প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও পাহাড়ি এলাকা)।

কোন মন্তব্য নেই