বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় - রংপুর
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর: জ্ঞান ও সবুজের অনন্য মেলবন্ধন
ভূমিকা
রংপুর মহানগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় ৭৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এর স্থাপত্যশৈলী এবং চিরসবুজ ক্যাম্পাস পর্যটকদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য:
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের স্মৃতিকে চিরঅম্লান রাখতে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। প্রথমে এটি 'রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়' নামে পরিচিত থাকলেও ২০০৯ সালে এর নাম পরিবর্তন করে 'বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়' রাখা হয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে এটি শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি রংপুরের আধুনিকায়নের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত।
নামকরণ:
বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর জন্মস্থান রংপুরের মিঠাপুকুর হওয়াতে এই নামকরণের সার্থকতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিল্প-সৌন্দর্য:
বেরোবি ক্যাম্পাসের প্রধান আকর্ষণ হলো এর পরিকল্পিত বনায়ন এবং লাল ইটের আধুনিক ভবনসমূহ। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতেই আপনাকে স্বাগত জানাবে বিশাল একটি গেট এবং দুপাশে ছায়াঘেরা রাস্তা। ক্যাম্পাসের কেন্দ্রে অবস্থিত 'স্বাধীনতা স্মারক' ভাস্কর্যটি এক অনন্য শিল্পকর্ম, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, ক্যাফেটেরিয়া এবং বিশাল লাইব্রেরি ভবনের স্থাপত্যশৈলী পর্যটকদের নজর কাড়ে। ক্যাম্পাসের ভেতরে রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ এবং ছোট-বড় বেশ কিছু পুকুর, যেখানে বিকেলের রোদ পড়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়। বসন্তকালে সোনালু ও কৃষ্ণচূড়ার ফুলে যখন ক্যাম্পাস রঙিন হয়ে ওঠে, তখন এটি এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে।কোথায় ও কেন যাবেন?
এটি রংপুর শহরের দক্ষিণ প্রান্তে মডার্ন মোড় এলাকায় অবস্থিত।
কেন যাবেন: শান্ত ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সময় কাটাতে এবং একটি আধুনিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবনের আমেজ নিতে এখানে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে বিকেলে বন্ধু বা পরিবার নিয়ে হাঁটার জন্য এটি রংপুরের অন্যতম সেরা নিরাপদ স্থান।
কখন যাবেন?
বছরের যেকোনো দিন ক্যাম্পাস খোলা থাকে। তবে ক্লাস চলাকালীন সময়ে (রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। বিকেলের সময়টি (বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা) ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
কীভাবে যাবেন / রুট (স্টেপ বাই স্টেপ)
১. ঢাকা থেকে: ঢাকা থেকে রংপুরগামী যেকোনো বাসে উঠে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে (মডার্ন মোড়) নামা যায়।
২. রংপুর শহর থেকে: শহরের প্রধান কেন্দ্র (জাহাজ কোম্পানি বা পায়রা চত্বর) থেকে অটো-রিকশা বা সিএনজিতে করে 'মডার্ন মোড়' বা 'বেরোবি' বললেই পৌঁছে দেবে।
৩. ভাড়া: শহর থেকে অটোতে ২০-৩০ টাকা।
কী দেখতে পাবেন?
স্বাধীনতা স্মারক: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকী ভাস্কর্য।
লাইব্রেরি ভবন: বিশালাকার এবং দৃষ্টিনন্দন লাল ইটের ভবন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার: ক্যাম্পাসের অন্যতম সুন্দর স্থাপনা।
রক গার্ডেন ও বোটানিক্যাল বাগান: বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ ও পাথরের সংগ্রহ।
ক্যাফেটেরিয়া: শিক্ষার্থীদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র।
খরচ ও প্রবেশমূল্য
প্রবেশ: বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট বা ফি লাগে না। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত (তবে নির্দিষ্ট সময় পর বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে)।
যাতায়াত: খরচ অত্যন্ত সামান্য, স্থানীয় যাতায়াত ১০০ টাকার মধ্যেই হয়ে যাবে।
খাওয়ার ব্যবস্থা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়াতে সুলভ মূল্যে দুপুরের খাবার ও নাস্তা পাওয়া যায়। এছাড়া মডার্ন মোড় এলাকায় প্রচুর হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায়।
আবাসন ব্যবস্থা
ক্যাম্পাসটি শহরের খুব কাছে হওয়ায় থাকার জন্য আলাদা ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। পর্যটকরা রংপুর শহরের যেকোনো ভালো মানের হোটেলে থাকতে পারেন।
দৃষ্টি আকর্ষণ
ক্যাম্পাসের উত্তর পাশে থাকা ঝাউবন এবং সারিবদ্ধ দেবদারু গাছগুলো ছবি তোলার জন্য দারুণ একটি স্পট। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গম্বুজাকৃতি প্রবেশদ্বারটি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে।
সতর্কতা ও টিপস
সতর্কতা: ক্যাম্পাস একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাই শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন। যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না।
টিপস ১: বিকেলের দিকে যাবেন, কারণ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আড্ডা ও গানের আসর উপভোগ করা যায়।
টিপস ২: ক্যাম্পাসের ভেতরে বেশি গতিতে যানবাহন চালাবেন না।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
১. পায়রাবন্দ: বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা এখান থেকে মাত্র ১০-১২ কিলোমিটার দূরে।
২. তাজহাট রাজবাড়ি: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অটোতে ১৫ মিনিটের পথ।
৩. রংপুর জাদুঘর: তাজহাট রাজবাড়ির ভেতরেই অবস্থিত।


কোন মন্তব্য নেই