আনন্দনগর ও এমপির দিঘি পীরগঞ্জ, রংপুর
আনন্দনগর ও এমপির দিঘি পীরগঞ্জ: এক ঠিকানায় ইতিহাস ও বিনোদন
ভূমিকা
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত আনন্দনগর এবং তার কোল ঘেঁষে থাকা বিশাল এমপির দিঘি বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি একই সাথে একটি বিনোদন পার্ক এবং একটি ঐতিহাসিক বিশাল জলাশয়ের সমন্বয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য:
'এমপির দিঘি' নিয়ে এলাকায় নানাবিধ লোককথা প্রচলিত রয়েছে। বিশাল আয়তনের এই দিঘিটি কয়েকশ বছরের পুরনো। স্থানীয়দের মতে, প্রাচীনকালে কোনো এক প্রভাবশালী জমিদার বা শাসক জনকল্যাণে এটি খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে এই বিশাল দিঘির পাড় এবং সংলগ্ন এলাকাকে সংস্কার করে 'আনন্দনগর' নামক একটি আধুনিক পিকনিক স্পট ও বিনোদন পার্ক গড়ে তোলা হয়। দিঘির নীল জলরাশি আর পাড়ের সবুজ ঘাসের গালিচা উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য অবকাশ যাপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটি বর্তমানে পীরগঞ্জ তথা রংপুর জেলার অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎপাদনকারী পর্যটন স্পট।
নামকরণ:
দিঘিটি অনেক আগে থেকেই 'এমপির দিঘি' হিসেবে পরিচিত। এই নামকরণের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জনশ্রুতির ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে, দর্শনার্থীদের মানসিক প্রশান্তি বা আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পার্কটির নাম রাখা হয়েছে 'আনন্দনগর'।
শিল্প-সৌন্দর্য:
আনন্দনগর ও এমপির দিঘির মূল আকর্ষণ হলো এর বিশালতা। দিঘির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দিকে তাকালে মনে হয় যেন এক ছোট সমুদ্র। দিঘির পাড় জুড়ে রয়েছে সারিবদ্ধ নারিকেল ও সুপারি গাছ, যা গ্রামীণ স্নিগ্ধতা বাড়িয়ে দেয়। পার্কের ভেতরে রয়েছে কৃত্রিম ঝরনা, বিভিন্ন পশু-পাখির ভাস্কর্য এবং শিশুদের জন্য রোলার কোস্টার ও ট্রেনের মতো আধুনিক রাইড। দিঘির শান্ত পানিতে যখন পর্যটকরা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ান, তখন এক দারুণ প্রাকৃতিক শিল্পকর্মের সৃষ্টি হয়। শীতকালে এই দিঘিতে প্রচুর অতিথি পাখির সমাগম ঘটে, যা পর্যটকদের জন্য বাড়তি পাওনা।
কোথায় ও কেন যাবেন?
এটি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে সামান্য দূরে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের কাছে অবস্থিত।
কেন যাবেন: আপনি যদি বিশাল দিঘির পাড়ে বসে বিকেলের হাওয়া খেতে চান এবং পরিবারের ছোট সদস্যদের যান্ত্রিক বিনোদনের ব্যবস্থা করতে চান, তবে আনন্দনগর সেরা পছন্দ। এছাড়া বিশাল দিঘিতে বোট রাইডিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে এখানে আসা প্রয়োজন।
কখন যাবেন?
বছরের যেকোনো সময় যাওয়া যায়। তবে সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে আবহাওয়া মনোরম থাকে। বিশেষ করে শীতের বিকেলে এমপির দিঘির সূর্যাস্ত অসাধারণ লাগে।
কীভাবে যাবেন / রুট (স্টেপ বাই STEP)
১. ঢাকা থেকে: ঢাকা থেকে রংপুরগামী যেকোনো বাসে উঠে পীরগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। সেখান থেকে অটোতে আনন্দনগর।
২. রংপুর শহর থেকে: রংপুর শহরের মডার্ন মোড় থেকে বাসে বা লোকাল হিউম্যান হলারে পীরগঞ্জ আসা যায়। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা।
৩. যাতায়াত মাধ্যম: পীরগঞ্জ সদর থেকে ইজিবাইক বা ভ্যানে ১৫-২০ মিনিটেই আনন্দনগর ও এমপির দিঘিতে পৌঁছানো যায়।
কী দেখবেন?
বিশাল এমপির দিঘি: এর বিশাল নীল জলরাশি।
বোট রাইডিং: স্পিডবোট বা প্যাডেল বোটে দিঘি ভ্রমণ।
শিশুদের পার্ক: আনন্দনগরের ভেতরে থাকা আধুনিক রাইডসমূহ।
পাখির কলকাকলি: শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ।
পিকনিক জোন: ছায়াঘেরা পরিবেশে রান্নাবান্না ও আড্ডার স্থান।
খরচ ও প্রবেশমূল্য
প্রবেশ টিকেট: আনন্দনগরে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ২০-৩০ টাকা ফি নেওয়া হয়।
রাইড খরচ: প্রতিটি রাইড ৩০-৫০ টাকার মধ্যে।
নৌকা ভ্রমণ: সময় ও বোটে বসার ক্ষমতা অনুযায়ী ১০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
খাওয়ার ব্যবস্থা
আনন্দনগর পার্কের ভেতরেই রেস্টুরেন্ট এবং হালকা নাস্তার দোকান আছে। পীরগঞ্জ সদরে এলে ভালো মানের ভাতের হোটেল পাওয়া যায়, যেখানে স্থানীয় দেশি মাছের পদ পাওয়া যায়।
আবাসন ব্যবস্থা
আনন্দনগর বা দিঘি এলাকায় থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। থাকার জন্য পীরগঞ্জ ডাক-বাংলো বা রংপুর শহরে ফিরে গিয়ে আবাসিক হোটেলে থাকাই সবচেয়ে ভালো।
দৃষ্টি আকর্ষণ
দিঘির চারপাশের চার কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথটি সকাল-বিকেল শরীরচর্চা ও হাঁটার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। দিঘির মাঝখানে থাকা ছোট দ্বীপের মতো অংশটি পর্যটকদের ছবি তোলার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সতর্কতা ও টিপস
সতর্কতা: দিঘির পানি অনেক গভীর, তাই সাতার না জানলে পানিতে নামা বা লাইফ জ্যাকেট ছাড়া নৌকায় চড়া থেকে বিরত থাকুন।
টিপস ১: বিকেলের দিকে যান, কারণ রোদে দিঘির পাড়ে হাঁটা বেশ কষ্টকর হতে পারে।
টিপস ২: ছুটির দিনে প্রচুর ভিড় থাকে, নিরিবিলি চাইলে সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
১. জয়সদন: পীরগঞ্জের ফতেহপুরে অবস্থিত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সমাধি ও পৈতৃক বাড়ি।
২. খাঁটাসাগর দিঘি: পীরগঞ্জের আরেকটি বড় জলাশয়।

magi paoyai
উত্তরমুছুন