তৎসম শব্দ চেনার সহজ কৌশল ও শর্টকাট নিয়ম | Munshi Alim
তৎসম শব্দ চেনার সহজ কৌশল ও শর্টকাট নিয়ম | Munshi Alim
তৎসম শব্দ চেনার সহজ কৌশল ও শর্টকাট নিয়ম |
বাংলা ব্যাকরণে শব্দের উৎপত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ, NTRCA, শিক্ষক নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শব্দের উৎস থেকে প্রশ্ন আসে। বিশেষ করে তৎসম, তদ্ভব, অর্ধতৎসম ও দেশি-বিদেশি শব্দ চেনার বিষয়টি পরীক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের আলোচনায় থাকছে তৎসম শব্দের পরিচয়, চেনার সহজ কৌশল, শর্টকাট নিয়ম এবং উদাহরণ।
তৎসম শব্দ কাকে বলে?
যেসব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসরি বাংলা ভাষায় এসেছে এবং মূলত সংস্কৃতের রূপ বজায় রেখেছে, সেগুলোকে তৎসম শব্দ বলে।
‘তৎসম’ শব্দের অর্থ—তার সমান বা তার মতো। এখানে ‘তৎ’ বলতে সংস্কৃতকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, সংস্কৃতের মতো যে শব্দ, সেটিই তৎসম শব্দ।
উদাহরণ: চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, হস্ত, কর্ণ, চক্ষু, গৃহ, মস্তক, রাত্রি, ধর্ম, কর্ম, বিদ্যা, শিক্ষা, ভাষা, সমাজ, সাহিত্য।
তৎসম শব্দ চেনার সহজ কৌশল
◆ কৌশল ১: সংস্কৃতের মূল রূপ খেয়াল করুন
যেসব শব্দ সংস্কৃতের মূল রূপ বজায় রেখে বাংলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলো সাধারণত তৎসম শব্দ।
উদাহরণ:
হস্ত
কর্ণ
চক্ষু
গৃহ
মস্তক
অগ্নি
রাত্রি
চন্দ্র
এগুলোর পরিবর্তিত বা কথ্য রূপের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়।
◆ কৌশল ২: একই অর্থের শব্দ পাশাপাশি রাখুন
একই অর্থ প্রকাশকারী তৎসম ও তদ্ভব শব্দ পাশাপাশি মনে রাখলে পরীক্ষায় দ্রুত উত্তর দেওয়া যায়।
| তৎসম শব্দ | তদ্ভব শব্দ |
|---|---|
| হস্ত | হাত |
| কর্ণ | কান |
| চক্ষু | চোখ |
| দন্ত | দাঁত |
| নাসিকা | নাক |
| মস্তক | মাথা |
| গৃহ | ঘর |
| অগ্নি | আগুন |
| হস্তী | হাতি |
| চন্দ্র | চাঁদ |
| রাত্রি | রাত |
| দুগ্ধ | দুধ |
| জিহ্বা | জিভ |
| মৎস্য | মাছ |
| সাপের ক্ষেত্রে সর্প | সাপ |
মনে রাখুন: তদ্ভব শব্দ সংস্কৃত শব্দের বিবর্তিত রূপ। তবে শুধু শব্দের উচ্চারণ ছোট বা সহজ হলেই সেটি তদ্ভব হয় না; শব্দটির ঐতিহাসিক উৎপত্তিও বিবেচ্য।
◆ কৌশল ৩: যুক্তবর্ণযুক্ত শব্দের দিকে নজর দিন
অনেক তৎসম শব্দে যুক্তবর্ণ দেখা যায়। যেমন—
অগ্নি
চন্দ্র
মন্ত্র
জ্ঞান
কর্ম
ধর্ম
তত্ত্ব
বিদ্বান
লক্ষ্মী
শক্তি
তবে যুক্তবর্ণ থাকলেই কোনো শব্দ তৎসম হবে—এমন নিয়ম নেই। এটি কেবল মনে রাখার একটি সহায়ক কৌশল।
◆ কৌশল ৪: সংস্কৃতের বিশেষ ধ্বনি ও বানান লক্ষ করুন
তৎসম শব্দে অনেক সময় ণ, ষ, ঋ, ঔ, ঐ কিংবা সংস্কৃতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বানান দেখা যায়।
উদাহরণ:
ঋষি
কৃষ্ণ
তৃষ্ণা
ঔষধ
ঐক্য
দৃষ্টি
পৃষ্ঠ
কৃতজ্ঞ
কিন্তু এগুলোর কোনোটিই এককভাবে তৎসম হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ নয়। শব্দের উৎস জানা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
◆ কৌশল ৫: পরিচিত তৎসম শব্দের তালিকা মুখস্থ করুন
পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বহুল ব্যবহৃত তৎসম শব্দগুলো কয়েকটি দলে ভাগ করে মনে রাখতে পারেন।
প্রকৃতি ও জগৎ: সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, আকাশ, পৃথিবী, অগ্নি, বায়ু, জল, সমুদ্র।
শরীরের অঙ্গ: হস্ত, কর্ণ, চক্ষু, দন্ত, নাসিকা, মস্তক, জিহ্বা, হৃদয়।
শিক্ষা ও জ্ঞান: বিদ্যা, শিক্ষা, জ্ঞান, বিদ্যালয়, গ্রন্থ, পাঠ, পরীক্ষা, শিক্ষক।
সমাজ ও রাষ্ট্র: সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ, জাতি, সভা, মন্ত্রী, বিচার, শাসন।
ধর্ম ও নৈতিকতা: ধর্ম, কর্ম, পুণ্য, পাপ, সত্য, ন্যায়, অহিংসা, মুক্তি।
ভাষা ও সাহিত্য: ভাষা, সাহিত্য, কবিতা, কাব্য, ছন্দ, অলংকার, ব্যাকরণ, সংস্কৃতি।
তৎসম, তদ্ভব ও অর্ধতৎসম শব্দের পার্থক্য
| শব্দের প্রকার | পরিচয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| তৎসম | সংস্কৃত থেকে সরাসরি গৃহীত | হস্ত, কর্ণ, চক্ষু |
| তদ্ভব | সংস্কৃত শব্দ প্রাকৃত ও অন্যান্য ঐতিহাসিক ভাষার স্তর পেরিয়ে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে | হাত, কান, চোখ |
| অর্ধতৎসম | সংস্কৃত শব্দের সামান্য পরিবর্তিত কথ্য রূপ | জ্যোৎস্না → জোছনা, গৃহিণী → গিন্নি |
| দেশি | বাংলা অঞ্চলের দেশীয় ভাষা থেকে আগত শব্দ | ডাব, ঢেঁকি |
| বিদেশি | অন্য ভাষা থেকে বাংলায় গৃহীত শব্দ | স্কুল, আদালত, আলমারি |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: শব্দের শ্রেণিবিভাগে কিছু ক্ষেত্রে পাঠ্যবই ও ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণে পার্থক্য দেখা যেতে পারে। পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের শ্রেণিবিভাগ অনুসরণ করা ভালো।
পরীক্ষায় কাজে লাগবে এমন শর্টকাট
◆ হাত–হস্ত, কান–কর্ণ, চোখ–চক্ষু: জোড়ায় জোড়ায় মনে রাখুন।
◆ দাঁত–দন্ত, নাক–নাসিকা, মাথা–মস্তক: কথ্য রূপ ও তৎসম রূপ আলাদা করে শিখুন।
◆ আগুন–অগ্নি, ঘর–গৃহ, রাত–রাত্রি: বহুল পরীক্ষিত শব্দজোড়াগুলো বারবার অনুশীলন করুন।
◆ বানান দেখে অনুমান করুন, কিন্তু উৎস যাচাই করুন: যুক্তবর্ণ বা বিশেষ বানান সহায়ক হতে পারে; একা এগুলো দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
অনুশীলনী: তৎসম শব্দ চিহ্নিত করুন
নিচের প্রতিটি জোড়া থেকে তৎসম শব্দটি বেছে নিন।
১. হাত / হস্ত
২. কান / কর্ণ
৩. চোখ / চক্ষু
৪. রাত / রাত্রি
৫. আগুন / অগ্নি
৬. দাঁত / দন্ত
৭. ঘর / গৃহ
৮. মাছ / মৎস্য
৯. মাথা / মস্তক
১০. দুধ / দুগ্ধ
উত্তরমালা
১. হস্ত
২. কর্ণ
৩. চক্ষু
৪. রাত্রি
৫. অগ্নি
৬. দন্ত
৭. গৃহ
৮. মৎস্য
৯. মস্তক
১০. দুগ্ধ
তৎসম শব্দ চেনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সংস্কৃতের মূল রূপ সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং তৎসম-তদ্ভব শব্দজোড়া নিয়মিত অনুশীলন করা। শুধু বানান বা যুক্তবর্ণ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
নিয়মিত অনুশীলন করলে বাংলা ব্যাকরণের এই অংশটি বিসিএস, ব্যাংক, NTRCA ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য সহজ হয়ে উঠবে।
লেখক: মুনশি আলিম
মুনশি একাডেমি | বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ শেখার সহজ পাঠ
কোন মন্তব্য নেই