সাতগাছিয়া মসজিদ: বারোবাজারের এক প্রাচীন প্রত্নসম্পদ
সাতগাছিয়া মসজিদ: বারোবাজারের এক প্রাচীন প্রত্নসম্পদ
ভূমিকা
ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার এক সময় ছিল মধ্যযুগীয় বাংলার এক সমৃদ্ধ নগরী। দীর্ঘকাল মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই নগরীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো 'সাতগাছিয়া মসজিদ'। ১৯৮৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননকার্যের ফলে এই মসজিদটি লোকচক্ষুর সামনে আসে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং ১৫শ শতাব্দীর বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য মাইলফলক।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট:
সাতগাছিয়া মসজিদের সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে পাথুরে প্রমাণ না থাকলেও এর স্থাপত্যরীতি দেখে ধারণা করা হয়, এটি সুলতান রুকনউদ্দিন বারবাক শাহ অথবা সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহের শাসনামলে (১৪৫০-১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে) নির্মিত হয়েছিল। মধ্যযুগে এই অঞ্চলটি 'খলিফাতাবাদ' রাজ্যের অংশ ছিল। দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত থাকার ফলে এটি একটি বিশাল মাটির ঢিবিতে পরিণত হয়েছিল, যা স্থানীয়দের কাছে 'সাতগাছিয়া ঢিবি' নামে পরিচিত ছিল। খননের পর দেখা যায়, এটি গৌড়ের লোটন মসজিদ বা ষাট গম্বুজ মসজিদের সমসাময়িক এক বিশাল স্থাপত্য। বারোবাজারের অন্যান্য ১৫-১৬টি মসজিদের মধ্যে এটি আয়তনে অন্যতম বৃহত্তম।
নামকরণের ইতিহাস:
মসজিদটির কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি বিধায় এর আদি নাম জানা সম্ভব হয়নি। তবে যে গ্রামে এটি অবস্থিত তার নাম 'সাতগাছিয়া'। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, এই মসজিদের ঢিবির ওপর একসময় সাতটি বিশাল গাছ ছিল, যা থেকে গ্রাম এবং পরবর্তীতে মসজিদের নাম হয়ে যায় 'সাতগাছিয়া মসজিদ'।
শিল্পসার্থকতা ও স্থাপত্যশৈলী:
সাতগাছিয়া মসজিদটি একটি বহু গম্বুজ বিশিষ্ট আয়তাকার মসজিদ। এর শিল্পসার্থকতা লুকিয়ে আছে এর দেয়ালে থাকা সূক্ষ্ম টেরাকোটা বা পোড়ামাটির নকশায়। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি সুদৃশ্য মেহরাব রয়েছে, যা লতাপাতা, ফুল এবং জ্যামিতিক নকশায় অলঙ্কৃত। মসজিদের ভেতরে পাথরের খাম্বা বা পিলারগুলোর বিন্যাস অত্যন্ত নিখুঁত। এর নির্মাণে ব্যবহৃত পাতলা লাল ইট এবং চুন-সুরকির মিশ্রণ সুলতানি আমলের ঘরানাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। মসজিদের চারকোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির মিনার রয়েছে, যা স্থাপত্যটিকে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য দান করেছে। এটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের 'টেরাকোটা আর্ট'-এর এক জীবন্ত প্রদর্শনী।
কোথায় অবস্থিত? (Location)
এটি খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ইউনিয়নে সাতগাছিয়া গ্রামে অবস্থিত। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার।
কেন যাবেন? (Reason to Visit)
প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়: মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা ৫০০ বছরের পুরনো সুলতানি আমলের মসজিদ দেখার জন্য।
টেরাকোটা শিল্প: দেয়ালের গায়ে থাকা আদি ও নিখুঁত পোড়ামাটির নকশা পর্যবেক্ষণ করতে।
ঐতিহাসিক বারোবাজার: একসাথে অনেকগুলো প্রাচীন মসজিদ (যেমন: খানজাহান আলী মসজিদ, গোয়ারখানা মসজিদ) দেখার সুযোগ।
শান্ত পরিবেশ: কোলাহলমুক্ত গ্রামীণ পরিবেশে ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে।
কখন যাবেন? (Best Time to Visit)
ভ্রমণের জন্য শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) সবচাইতে আরামদায়ক। তবে বর্ষাকালে চারপাশের সবুজ প্রকৃতির মাঝে লাল ইটের এই মসজিদটি দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন লাগে।
কীভাবে যাবেন / রুট প্ল্যান (Step by Step Route)
১. যশোর বা ঝিনাইদহ থেকে: যশোর বা ঝিনাইদহ শহর থেকে যেকোনো বাসে করে 'বারোবাজার' বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে।
২. বাসস্ট্যান্ড থেকে: বারোবাজার স্ট্যান্ড থেকে ইজিবাইক বা ভ্যান রিজার্ভ করে সাতগাছিয়া মসজিদ যাওয়া যায় (সময় লাগবে ১৫-২০ মিনিট)।
৩. ট্রেনযোগে: খুলনা থেকে চিলাহাটি বা ঢাকাগামী ট্রেনে 'মোবারকগঞ্জ' স্টেশনে নেমে ইজিবাইকে আসা যায়।
কী দেখবেন ও উপভোগ করবেন? (Main Attractions)
টেরাকোটা অলঙ্কৃত মেহরাব: মসজিদের ভেতরের দেয়ালে থাকা অপূর্ব নকশা।
অষ্টভুজাকৃতির মিনার: চারকোণের প্রাচীন বুরুজ।
বহু গম্বুজের কাঠামো: গম্বুজগুলো এখন বিলীন হলেও ছাদ ও পিলারের বিন্যাস দেখার মতো।
পার্শ্ববর্তী অন্যান্য মসজিদ: হাঁটা দূরত্বে থাকা বারোবাজারের আরও ৪-৫টি প্রাচীন মসজিদ।
খরচ (Expenses)
সাতগাছিয়া মসজিদে প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ ফি নেই। এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত হলেও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। যাতায়াত খরচ খুবই সামান্য।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা (Transport & Dining)
পরিবহন: ইজিবাইক, রিকশা এবং ভ্যান।
খাবার: বারোবাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সাধারণ মানের হোটেল আছে। ভালো খাবারের জন্য কালিগঞ্জ বা যশোর শহরে ফিরে আসা ভালো। ঝিনাইদহের বিখ্যাত মিষ্টি ও দই চেখে দেখতে পারেন।
যোগাযোগ ও আবাসন (Accommodation)
বারোবাজারে থাকার ভালো ব্যবস্থা নেই। থাকার জন্য ঝিনাইদহ জেলা সদর অথবা যশোর শহরের হোটেলগুলো সবচাইতে ভালো।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা (Cautions)
এটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ, তাই দেয়ালের গায়ে কোনো কিছু লিখবেন না বা ইট খসানোর চেষ্টা করবেন না।
মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করুন এবং উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
যত্রতত্র প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Attractions)
বারোবাজারের অন্যান্য মসজিদ (গোয়ারখানা, শুকুর মল্লিক, নুনগোলা মসজিদ)।
নলডাঙ্গা রাজবাড়ি।
জহুরুল হক পার্ক।
টিপস (Tips)
বারোবাজার এলাকায় ১৫টিরও বেশি প্রাচীন স্থাপনা আছে। তাই একটি ইজিবাইক পুরো দিনের জন্য রিজার্ভ করে নিলে আপনি সাতগাছিয়া মসজিদের পাশাপাশি সবগুলো প্রাচীন নিদর্শন একসাথে ঘুরতে পারবেন।

কোন মন্তব্য নেই