সাবাস বাংলাদেশ: পাথুরে ক্যানভাসে বাঙালির বীরত্বের মহাকাব্য
সাবাস বাংলাদেশ: পাথুরে ক্যানভাসে বাঙালির বীরত্বের মহাকাব্য
ভূমিকা (Introduction):
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের প্রতীক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক সুউচ্চ মিনার হলো 'সাবাস বাংলাদেশ' ভাস্কর্য। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ভাস্কর্যটি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির অকুতোভয় সাহস এবং বিজয়ের আকাঙ্ক্ষাকে এক অনন্য শৈল্পিক রূপ দিয়েছে। প্রখ্যাত শিল্পী ও ভাস্কর নিতুন কুণ্ডুর অমর সৃষ্টি এটি। ভাস্কর্যটির পাদদেশে দাঁড়ালে কেবল পাথর আর সিমেন্টের কারুকার্য নয়, বরং অনুভব করা যায় একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর ধ্বনি। নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর কৃতজ্ঞতা এবং প্রশংসা—যা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বিখ্যাত পঙ্ক্তি 'সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়' থেকে নেওয়া হয়েছে।
ভাস্কর্যটির মূল কাঠামোতে দুই জন মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাদের একজন লুঙ্গি পরা, মাথায় গামছা বাঁধা—যিনি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি এবং অন্যজন শার্ট-প্যান্ট পরা শহুরে যুবক। দুজনের হাতেই রয়েছে আধুনিক অস্ত্র এবং তারা যেন রণক্ষেত্র থেকে বিজয়ের পতাকা নিয়ে এগিয়ে আসছেন। তাদের পেছনে একটি বিশাল বৃত্তাকার দেওয়াল রয়েছে, যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক। সেই সূর্যের বুকে খোদাই করা হয়েছে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের বীরত্বগাথা। পুরো ভাস্কর্যটি একটি বিশাল চত্বরের ওপর নির্মিত, যেখানে দাঁড়ালে কেবল মুক্তিযুদ্ধ নয়, বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের গর্ব অনুভূত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি সারা বছরই মুখরিত থাকে।
কোথায় অবস্থিত? (Location)
এটি রাজশাহী মহানগরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সিনেট ভবনের উত্তর পার্শ্বে এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে অবস্থিত। ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে একটু সামনে এগোলেই এই বিশাল চত্বরটি চোখে পড়বে।
কেন যাবেন? (Reason to Visit)
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: একাত্তরের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের দৃশ্য ও জাতীয় চেতনার প্রতীক দেখতে।
শিল্প ও ভাস্কর্য: প্রখ্যাত শিল্পী নিতুন কুণ্ডুর অসাধারণ নির্মাণশৈলী সরাসরি দেখার জন্য।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, উৎসব ও দেশপ্রেমের কেন্দ্রবিন্দু দেখার জন্য।
স্মৃতিচারণ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে।
কখন যাবেন? (Best Time to Visit)
সারা বছরই এটি উন্মুক্ত থাকে। তবে শীতকাল এবং বিকেলের সময় সবচেয়ে আরামদায়ক। বিশেষ করে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস এবং ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে এখানে সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম ও উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে।
কীভাবে যাবেন / রুট প্ল্যান (Step by Step Route)
১. রাজশাহী শহর থেকে: সাহেব বাজার বা রেল স্টেশন থেকে ব্যাটারিচালিত অটো-রিকশা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে নামতে হবে।
২. ক্যাম্পাসের ভেতর: মেইন গেট থেকে সোজা হেঁটে বা রিকশায় করে লাইব্রেরি বা সিনেট ভবনের সামনে গেলেই ভাস্কর্যটি দেখা যাবে।
কী দেখবেন? (What to See)
মূল ভাস্কর্য: দুই মুক্তিযোদ্ধার অকুতোভয় অবয়ব এবং রাইফেলের শৈল্পিক উপস্থাপন।
উদীয়মান সূর্য: পেছনে থাকা বিশাল গোলাকার দেওয়াল এবং তার ওপরের কারুকার্য।
মুক্তমঞ্চ: ভাস্কর্যের নিচে থাকা বিশাল বেদী যেখানে বিভিন্ন সময় নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
সংলগ্ন উদ্যান: ভাস্কর্য চত্বরের চারপাশের সবুজ ঘাস ও ফুলের বাগান।
খরচ (Expenses)
এটি একটি উন্মুক্ত ভাস্কর্য, তাই এখানে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা (Transport & Dining)
পরিবহন: অটো-রিকশা এবং রিকশা।
খাবার: ভাস্কর্যের খুব কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের 'টুকিটাকি চত্বর' ও 'স্টেশন বাজার' এলাকায় সুলভ মূল্যে বিভিন্ন খাবার ও ঐতিহ্যবাহী চা পাওয়া যায়।
যোগাযোগ ও আবাসন (Accommodation)
বিশ্ববিদ্যালয় গেটের পাশেই রাজশাহী পর্যটন মোটেল এবং শহরের ভেতর উন্নত মানের বহু হোটেল রয়েছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা (Cautions)
ভাস্কর্যের বেদীতে ওঠার সময় জুতো খুলে ওঠা সৌজন্যবোধের পরিচয়।
মূল ভাস্কর্য বা দেওয়ালে কোনো কিছু লিখবেন না বা আঁকবেন না।
চত্বরের পবিত্রতা রক্ষা করুন এবং কোনো আবর্জনা ফেলবেন না।
এটি একটি স্পর্শকাতর স্থান, তাই ছবি তোলার সময় গাম্ভীর্য বজায় রাখুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Attractions)
শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা।
প্যারিস রোড।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ।
জোহা চত্বর।
টিপস (Tips)
বিকেলের পড়ন্ত রোদে ভাস্কর্যটি দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে এবং ভালো ছবি তোলা যায়।
সাথে কোনো শিক্ষার্থী বন্ধু থাকলে এর পেছনের ইতিহাস আরও গভীরভাবে জানতে পারবেন।

কোন মন্তব্য নেই