কমলারাণীর দীঘি: হবিগঞ্জের ইতিহাসে এক বিষাদময় লোকগাথার সাক্ষী
কমলারাণীর দীঘি: হবিগঞ্জের ইতিহাসে এক বিষাদময় লোকগাথার সাক্ষী
ভূমিকা (Introduction)
সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত 'কমলারাণীর দীঘি' কেবল একটি বিশাল জলাধার নয়, বরং এটি এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ ও লোকজ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দীঘি, যা স্থানীয়ভাবে 'সাগরদিঘি' নামেও পরিচিত। আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলের রাজা নৃসিংহ দেব (মতান্তরে রাজা ননী দেব) তাঁর রাণী কমলারাণীর ইচ্ছায় প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে এই বিশাল দীঘিটি খনন করেন। এই দীঘিকে ঘিরে প্রচলিত আছে এক করুণ ও রহস্যময় লোকগাথা, যা আজও গ্রাম বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
জনশ্রুতি আছে, বিশাল এই দীঘি খননের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেখান থেকে কোনো পানি উঠছিল না। পরে রাজা স্বপ্নে আদেশ পান যে, রাণী কমলারাণী যদি দীঘির মাঝখানে গিয়ে পূজা দেন, তবেই পানি উঠবে। প্রজাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে রাণী যখন দীঘির মাঝখানে পৌঁছান, তখন অলৌকিকভাবে নিচ থেকে জলধারা উপচে উঠতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রাণী সেই অতল জলরাশিতে তলিয়ে যান। রাণীর এই আত্মত্যাগের কাহিনী আজও এই অঞ্চলের বাতাসকে ভারী করে তোলে। বিশাল আয়তনের এই দীঘিটি বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকলেও এর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন বৃক্ষরাজি আর শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের নিয়ে যায় ইতিহাসের কোনো এক গহীনে। আপনি যদি প্রাচীন ইতিহাস আর লোককাহিনীর প্রতি আগ্রহী হন, তবে কমলারাণীর দীঘি আপনার জন্য একটি অবশ্য দর্শনীয় স্থান।
কোথায় অবস্থিত? (Location)
এটি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার সদর থেকে প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি মূলত 'সাগরদিঘি' গ্রামেই অবস্থিত।
কেন যাবেন? (Reason to Visit)
লোকগাথা ও ইতিহাস: রাণী কমলারাণীর আত্মত্যাগের অমর কাহিনী এবং প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান করতে।
বিশাল জলাধার: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম এই দীঘির শান্ত ও বিশাল জলরাশি দেখতে।
শান্ত পরিবেশ: কোলাহলমুক্ত গ্রামীণ পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য।
নিকটবর্তী চা বাগান: এই দীঘির খুব কাছেই বেশ কিছু সুন্দর চা বাগান রয়েছে।
কখন যাবেন? (Best Time to Visit)
যেকোনো ঋতুতেই যাওয়া যায়। তবে শরৎকাল ও শীতকাল দীঘির পরিবেশ উপভোগ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। শীতে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখির আনাগোনাও লক্ষ্য করা যায়।
কীভাবে যাবেন / রুট প্ল্যান (Step by Step Route)
১. সিলেট বা ঢাকা থেকে: বাসে বা ট্রেনে প্রথমে হবিগঞ্জ বা শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে নামতে হবে।
২. শায়েস্তাগঞ্জ থেকে চুনারুঘাট: শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সিএনজি বা বাস যোগে চুনারুঘাট সদরে পৌঁছাতে হবে।
৩. চুনারুঘাট থেকে দীঘি: চুনারুঘাট সদর থেকে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশা যোগে সরাসরি 'কমলারাণীর দীঘি' বা 'সাগরদিঘি' যাওয়া যায় (ভাড়া ২০-৪০ টাকা)।
৪. নিজস্ব গাড়ি: ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে সরাসরি চুনারুঘাট এবং সেখান থেকে দীঘিতে পৌঁছানো সম্ভব।
কী দেখবেন? (What to See)
বিশাল দীঘি: ৬৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত টলটলে জলের দীঘি।
ঘাটের অবশিষ্টাংশ: দীঘির চারপাশের প্রাচীন ঘাটের ধ্বংসাবশেষ।
গ্রামীণ প্রকৃতি: দীঘির পাড়ের সারি সারি গাছ ও শান্ত স্নিগ্ধ গ্রাম।
পরিযায়ী পাখি: শীতকালে দীঘির জলে হাজার হাজার অতিথির পাখির জলকেলি।
খরচ (Expenses)
দীঘি এলাকায় প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট লাগে না। চুনারুঘাট থেকে যাতায়াত খরচ অত্যন্ত সামান্য। হবিগঞ্জ বা শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ৩০০০-৫০০০ টাকার মধ্যে পুরো একদিনের একটি ট্রিপ সম্পন্ন করা সম্ভব।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা (Transport & Dining)
পরিবহন: সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা বা বাস।
খাবার: দীঘি এলাকায় উন্নত মানের রেস্টুরেন্ট নেই। চুনারুঘাট সদরের স্থানীয় হোটেলে সাধারণ দেশি খাবার পাওয়া যায়। ভালো খাবারের জন্য শায়েস্তাগঞ্জ বা হবিগঞ্জ শহরে ফিরে আসা ভালো।
যোগাযোগ ও আবাসন (Accommodation)
দীঘির আশেপাশে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। থাকার জন্য পর্যটকরা সাধারণত শায়েস্তাগঞ্জ বা হবিগঞ্জ শহরের হোটেল বেছে নেন। এছাড়াও কাছাকাছি দূরত্বে 'সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান' সংলগ্ন রিসোর্টগুলোতেও থাকা যায়।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা (Cautions)
দীঘির পানি অনেক গভীর, তাই সাঁতার না জানলে পানিতে নামা থেকে বিরত থাকুন।
দীঘির পাড়ে কোনো ধরণের আবর্জনা বা প্লাস্টিক ফেলবেন না।
স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Attractions)
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান।
রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।
চুনারুঘাটের চা বাগানসমূহ।
টিপস (Tips)
সাথে হালকা নাস্তা ও পানীয় জল রাখুন।
হাতে সময় থাকলে একই দিনে 'সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান' ঘুরে আসতে পারেন।

কোন মন্তব্য নেই