ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক সবুজ চত্বর
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক সবুজ চত্বর
![]() |
ছবি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় |
ভূমিকা (ইতিহাস ও ঐতিহ্য)
১৯৭৯ সালের ২২শে নভেম্বর এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (আইইউ)। এটি কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুর প্রান্তরে ১৭৫ একরের এক বিশাল ও সবুজ ক্যাম্পাসে এর অবস্থান। তৎকালীন ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সুপারিশ এবং বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত দাবির প্রেক্ষিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুতে এটি কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও, সময়ের বিবর্তনে এটি বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসায় প্রশাসন এবং মানবিক অনুষদসহ একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯২০-এর দশকে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হলেও তা বাস্তবায়িত হতে কয়েক দশক সময় লাগে। ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সীমান্তে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর ১৯৮৬ সালে প্রথম শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমদিকে এর অবস্থান সাময়িকভাবে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে স্থানান্তরিত হলেও ১৯৯০ সালে এটি পুনরায় তার আদি স্থান শান্তিডাঙ্গায় ফিরে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গৌরবময় দিক হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সুযোগ। বর্তমানে এখানে ৩৪টি বিভাগ এবং প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। এটি কেবল দক্ষিণ বাংলার নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের গর্ব হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত।
বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ একে অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করেছে। এখানকার 'ডায়না চত্বর', 'মফিজ লেক' এবং দৃষ্টিনন্দন 'পারমানবিক ভাস্কর্য' দর্শকদের মুগ্ধ করে। এখানকার 'সাদ্দাম হোসেন হল' এবং বিশাল আয়তনের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবনটি স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা 'মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব' ম্যুরালটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে নিজস্ব বলিষ্ঠ সংস্কৃতি; বিশেষ করে এখানকার বাউল ও মরমি দর্শনের সাথে আধুনিক শিক্ষার এক মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। প্রতি বছর ২২শে নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস এবং বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে পুরো ক্যাম্পাস এক উৎসবমুখর সাজে সজ্জিত হয়। শান্ত ও স্নিগ্ধ এই ক্যাম্পাসের পথে পথে ফুটে থাকা ফুল আর সর্পিল হাঁটাপথ যে কাউকে মুহূর্তেই মোহিত করতে সক্ষম।
কোথায় অবস্থিত? (Location)
এটি রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের মিলনস্থলে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এর অবস্থান কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার এবং ঝিনাইদহ শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।
কেন যাবেন? (Reason to Visit)
সবুজ ক্যাম্পাস: ১৭৫ একরের বিশাল আয়তনের ছায়াঘেরা এবং প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর ক্যাম্পাস দেখার জন্য।
স্থাপত্যশৈলী: বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক একাডেমিক ভবন, দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা এবং ভাস্কর্যগুলো দেখার জন্য।
সাংস্কৃতিক পরিবেশ: দক্ষিণ বাংলার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে।
লেক ও বসার জায়গা: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা 'মফিজ লেক' এবং 'ডায়না চত্বর'-এর শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে।
কখন যাবেন? (Best Time to Visit)
সারা বছরই ক্যাম্পাস খোলা থাকে। তবে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময়, কারণ তখন ক্যাম্পাসের বাগানে নানা রঙের ফুল ফোটে।
সময়সূচী: সাধারণত সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময় দর্শনার্থীদের জন্য ভ্রমণের পরিবেশ বেশি শান্ত থাকে।
কীভাবে যাবেন / রুট প্ল্যান (Step by Step Route)
১. কুষ্টিয়া শহর থেকে: কুষ্টিয়ার মজমপুর বা জিরো পয়েন্ট থেকে ইবিগামী স্পেশাল বাস বা সিএনজিতে সরাসরি ক্যাম্পাসে আসা যায় (সময় লাগে ৩০-৪০ মিনিট)।
২. ঝিনাইদহ শহর থেকে: ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল থেকে কুষ্টিয়াগামী যেকোনো বাসে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে নামা যায়।
৩. ঢাকা থেকে: ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী যেকোনো বাসে (যেমন: হানিফ, শ্যামলী) উঠে চালককে 'ইবি মেইন গেট' নামিয়ে দিতে বললে সরাসরি ক্যাম্পাসের সামনে নামা সম্ভব।
কী দেখবেন? (Main Attractions)
মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব: বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর স্মরণে নির্মিত বিশাল ম্যুরাল।
ডায়না চত্বর: আড্ডা ও আউটিংয়ের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এলাকা।
মফিজ লেক: বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত চমৎকার একটি জলাশয় ও লেক।
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি: দেশের অন্যতম বড় এবং দৃষ্টিনন্দন লাইব্রেরি ভবন।
পারমাণবিক ভাস্কর্য: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার প্রতীক হিসেবে নির্মিত স্থাপনা।
মেইন গেট ও ফোয়ারা: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশদ্বারের স্থাপত্য এবং সামনের পানির ফোয়ারা।
খরচ (Expenses)
ক্যাম্পাসে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না। যাতায়াত খরচ কুষ্টিয়া বা ঝিনাইদহ শহর থেকে জনপ্রতি ৫০-৮০ টাকার মধ্যে সম্ভব।
পরিবহন ও খাওয়ার ব্যবস্থা (Transport & Dining)
পরিবহন: বাস, সিএনজি এবং ইজিবাইক।
খাবার: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক ছোট ছোট ক্যাফেটেরিয়া এবং হোটেল রয়েছে। এছাড়া প্রধান ফটকের সামনে 'ইবি বাজারে' ভালো মানের খাবার হোটেল পাওয়া যায়।
যোগাযোগ ও আবাসন (Accommodation)
ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের থাকার জন্য গেস্ট হাউজ রয়েছে (অনুমতি সাপেক্ষে)। তবে সবচেয়ে ভালো হয় কুষ্টিয়া বা ঝিনাইদহ শহরের কোনো হোটেলে অবস্থান করা।
দৃষ্টি আকর্ষণ ও সতর্কতা (Cautions)
এটি একটি পবিত্র বিদ্যাপীঠ, তাই ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখুন।
কোনো ধরণের অপ্রীতিকর শব্দ বা হইচই করে শিক্ষার পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটাবেন না।
ফুল ছেঁড়া বা ক্যাম্পাসের সম্পদ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন।
প্লাস্টিক বর্জ্য নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলুন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Nearby Attractions)
ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ।
লালন শাহের মাজার (ছেঁউড়িয়া)।
শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি।
টিপস (Tips)
শুক্রবার বা শনিবার ক্যাম্পাস পরিদর্শনে গেলে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা কম থাকে, ফলে শান্তিতে ঘোরা যায়।
বিকেলের দিকে মফিজ লেকের পাড়ে সূর্যাস্ত দেখা এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই